1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

আরজি কর মামলায় নতুন মোড়, সুবিচারের প্রত্যাশা

১৬ মে ২০২৬

আরজি কর মামলার ফাইল ফের খুলল রাজ্য সরকার৷ সাসপেন্ড করা হল পুলিশের তিন কর্মকর্তাকে৷

https://p.dw.com/p/5DqSi
Indien Protestkundgebung zum einjährigen Jubiläum der Vergewaltigung und Ermordung eines Arztes im RG Kar-Krankenhaus
ছবি: Samir Jana/Hindustan Times/Sipa USA/picture alliance

২০২৪ সালের ৯ আগস্ট কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুন করা হয়৷ সেই ঘটনায় একজন দোষী সাব্যস্ত হলেও সন্তুষ্ট হতে পারেনি নিহতের পরিবার৷ তাদের মতোই অখুশি ছিল আন্দোলনকারী নাগরিক সমাজ৷

ফের খুলল ফাইল

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা ক্ষমতায় এলে আরজি কর-সহ অন্যান্য মামলার পুনর্তদন্ত করা হবে৷ ভোটে জেতার ১১ দিনের মাথায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কড়া পদক্ষেপ নিলেন৷ 

এই মামলার তদন্তে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল৷ তৎকালীন পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল, ডিসি সেন্ট্রাল  ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং ডিসি নর্থ অভিষেক গুপ্তাকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত শুক্রবার ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী৷ 

শুভেন্দু সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, ‘‘আরজি করের ঘটনার সময়ে কলকাতা পুলিশের এই তিন সিনিয়র পুলিশ আধিকারিকের কী ভূমিকা ছিল, তারা পরিবারকে ঘুষ দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে৷ দেখা হবে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের কোন নির্দেশ ছিল কি না৷ ফোন কল রেকর্ড ও হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট খতিয়ে দেখা হবে৷’’

তিনি জানান, আরজি করের ঘটনার সময়ে কলকাতা পুলিশের ভূমিকা ঠিক কী ছিল, তা জানতে মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্রসচিবের নেতৃত্বে গত কয়েকদিন ধরে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংয়ের কাজ করা হয়েছে৷ তার ভিত্তিতে রাজ্যের পদক্ষেপ৷

এই মামলার তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে রয়েছে৷ এবার পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে চাইছে রাজ্য৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘ওই সময়ে যে ঘটনা ঘটেছিল, সেটাকে বিপথে পরিচালিত করা, সঠিক ভাবে এফআইআরের পরে তদন্ত না করার অভিযোগ উঠেছিল৷ আমরা মূল তদন্তের দিকে যাচ্ছি না৷ ওটা সিবিআই করছে৷ আদালতে মামলা বিচারাধীন৷’’

সরকারের সিদ্ধান্তে খুশি নির্যাতিতার মা ও পানিহাটির বিজেপি বিধায়ক৷ সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘‘মেয়ের মৃতদেহ যখন বাড়িতে রাখা রয়েছে, সেই সময়ে ওর বাবার হাতে টাকা ধরাতে এসেছিলেন পুলিশকর্তা৷এই কথা যেন আমরা কাউকে না বলি, তার জন্য আমাদের হুমকি দেওয়া হয়েছিল৷ যদি মুখ খুলি তাহলে মেয়ে আর বিচার পাবে না৷’’

নিহত চিকিৎসকের বাবার বক্তব্য, ‘‘প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল৷ তিনি সেটা না করে উল্টে ব্যাপারটাকে চাপা দেওয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন, অপরাধীদের আড়াল করেছেন৷ এখন সেটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে৷’’

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ 

আরজি করের ঘটনার পরেই পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে৷ প্রাথমিক তদন্তে গাফিলতির পাশাপাশি নিহতের পরিবারকে উৎকোচ দেয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ৷ মুখপাত্র না হওয়া একজন নারী পুলিশকর্তা সাংবাদিক বৈঠক কেন করেছিলেন, সে প্রশ্ন উঠেছে৷

তথ্য প্রমাণ লোপাটের পিছনে বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের ভূমিকা রয়েছে: শাশ্বতী ঘোষ

গোড়া থেকেই পুলিশের ভূমিকা ছিল সন্দেহের কেন্দ্রে৷ সকালে চিকিৎসকের দেহ উদ্ধারের পরে মধ্যরাতে ভুল বয়ানে এফআইআর লেখা, নমুনা সংগ্রহে গাফিলতি, ঘটনাস্থলকে সুরক্ষিত না রাখার অভিযোগ ওঠে৷ এবার তিন পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে বিচারবিভাগীয় তদন্ত শুরু হবে৷

বিশেষত ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী৷ সাংবাদিক বৈঠকে শুভেন্দু বলেন, ‘‘সংবাদমাধ্যমের সামনে ডিসির আচরণ সুখকর ছিল না৷ তিনি কলকাতা পুলিশের মুখপাত্র ছিলেন না৷ তাকে লিখিতভাবে কেউ দায়িত্ব দেয়নি৷ তার কথা নারীশক্তি তথা রাজ্যের মর্যাদা নষ্ট করেছে৷’’

মূল ঘটনা অর্থাৎ ধর্ষণ ও খুনের বিচার হলেও আইপিএসদের ভূমিকা নিয়ে আগে কাটাছেঁড়া হয়নি৷ এই ঘটনায় সিভিক ভলেন্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে আদালত দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দিলেও আরো অনেকে জড়িত বলে দাবি করেছে চিকিৎসকের পরিবার থেকে নাগরিক সমাজ৷

আরজি কর আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন জুনিয়র চিকিৎসকরা৷ এই আন্দোলনের অগ্রণী নেতা, চিকিৎসক আসফাকুল্লা নাইয়া বলেন, ‘‘কোন প্রভাবশালীর কাছ থেকে নির্দেশ এসেছিল, কারা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, সেই বিষয়ে তদন্ত করতে হবে৷ ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায় মানুষকে ভুল বুঝিয়েছেন৷ অভিষেক গুপ্তা টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেছেন৷ কী উদ্দেশ্যে, কার নির্দেশে এসব করা হয়েছে, সেটা সামনে আসা দরকার৷’’

সাজা কি হবে

এই ঘটনায় সিভিক ভলেন্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দিয়েছে আদালত৷ সেই সঞ্জয় শিয়ালদা আদালতে হাজিরার সময়ে দাবি করে, বিনীত গোয়েল-সহ কলকাতা পুলিশের কয়েকজন কর্তা তাকে ফাঁসিয়েছেন৷ এরা কি আদৌ ধরা পড়বেন? যে উন্মত্ত জনতা হাসপাতালে ভাঙচুর চালিয়েছিল, তাদের কারা পাঠিয়েছিল, তার উত্তর কি পাওয়া যাবে?

সাবেক পুলিশকর্তা নজরুল ইসলাম ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আইপিএসদের বিরুদ্ধে তদন্ত হবে, দোষ প্রমাণিত হলে সাজা হবে৷ কিন্তু তার পরেও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যে অপরাধ করা হয়েছিল, তার বিচার হবে এমন আশা আমি দেখি না৷ এই মামলায় কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই৷ নিহত ও আসামির শারীরিক পরীক্ষা থেকে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যেতে পারত৷ কিন্তু কোনোটাই ভালোভাবে করা হয়নি৷’’

তার বক্তব্য, ‘‘পুলিশমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশ কমিশনার থেকে আরম্ভ করে তার অধস্তন অফিসাররা সকলেই প্রমাণ জোগাড় নয়, প্রমাণ লোপাটের জন্য নেমে পড়েছিলেন৷ পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে কাজ করে যদি ওসিকে জেলে যেতে হয়, তাহলে সিপির যাওয়া উচিত ছিল৷’’

জুনিয়রদের পাশাপাশি সিনিয়র চিকিৎসকরা বড় সংখ্যায় জড়িয়ে গিয়েছিলেন আন্দোলনের সঙ্গে৷ ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের পক্ষে চিকিৎসক কৌশিক চাকি ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আগের সরকার প্রায় সাড়ে ৫০০ দিন কিছু করেনি৷ বরং ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে৷ অপরাধীদের আড়াল করেছে৷ শপথ নেয়ার ছয় দিনের মধ্যে নতুন মুখ্যমন্ত্রী যে পদক্ষেপ নিলেন, তাতে আমরা আশাবাদী যে, এবার বিচার হবে৷’’

তবুও সংশয়ের দোলাচল থেকে যাচ্ছে৷ দোষী পুলিশকর্তা ও আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হলেও অপরাধীদের আর কি চিহ্নিত করা যাবে?

নারী অধিকার আন্দোলনের কর্মী, অধ্যাপক শাশ্বতী ঘোষ ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘শুধু পুলিশকর্তাদের চিহ্নিত করলে হবে না, তথ্য প্রমাণ লোপাটের পিছনে বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের ভূমিকা রয়েছে৷ তাদের চিহ্নিত করতে হবে৷ তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা দরকার৷’’

শুধু আরজি কর নয়, কামদুনি থেকে হাঁসখালি, তৃণমূল সরকারের আমলে হয়ে যাওয়া নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুনের অন্যান্য মামলার ফাইল খোলার দাবি উঠেছে৷ শাশ্বতী বলেন, ‘‘প্রমাণের অভাবে কামদুনির অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে গিয়েছে৷ অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ সাধারণ মানুষ তাদের ভয় পাচ্ছে৷ এই ফাইল অবশ্যই খোলা উচিত৷ বিচার হওয়া উচিত৷’’

ডয়চে ভেলের কলকাতা প্রতিনিধি পায়েল সামন্ত৷
পায়েল সামন্ত ডয়চে ভেলের কলকাতা প্রতিনিধি৷
স্কিপ নেক্সট সেকশন এই বিষয়ে আরো তথ্য