কলকাতা পুরসভা কেন তৃণমূলের হাতছাড়া হলো?
৯ জুন ২০২৬
বিধানসভা ভোটে হেরে ৪ মে তৃণমূলের হাতছাড়া হয়েছিল নীলবাড়ি নবান্ন। কিন্তু পুর নির্বাচনের অনেক আগেই কলকাতা পুরসভার লালবাড়িতেও ক্ষমতা হারালো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল।
দায়িত্বে নতুন প্রশাসক
সোমবার থেকে কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক দায়িত্বভার গ্রহণ করেন প্রশাসক স্মিতা পান্ডে। তিনি পুর কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। গত শুক্রবার মেয়র পদ থেকে ফিরহাদ হাকিমের ইস্তফার পরে তৃণমূলের বিদায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। তাতে সিলমোহর দিয়েছে প্রশাসকের নিয়োগ।
ফিরহাদ মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরে পুরবোর্ড ভেঙে দেওয়া হবে না কেন, সেই বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে নবান্ন থেকে নোটিস পাঠানো হয়েছিল। তিন দিনের মধ্যে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, যার শেষ সময়সীমা ছিল সোমবার।
ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গে প্রাক বর্ষার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বর্ষা শুরুর প্রাক্কালে কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছিল কলকাতা পুরসভা। সেই পরিস্থিতিতে নাগরিক পরিষেবায় কোনো ব্যাঘাত যাতে না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে দ্রুত অন্তর্বর্তী প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার।
রাজ্যপালের নির্দেশ অনুসারে পুর আইন মেনে মেয়র পারিষদ থেকে কাউন্সিলর, সকলের প্রশাসনিক ক্ষমতা বাতিল করা হয়েছে। যদিও এর আগে জল্পনা ছিল, পরবর্তী পুর নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নাগরিক পরিষেবার স্বার্থে কাউন্সিলররাই দায়িত্ব পালন করবেন।
মেয়াদ ছিল ৬ মাস
কলকাতা পুরসভার শেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালে। বর্তমান পুরবোর্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী ডিসেম্বর মাসে। অর্থাৎ পুরভোট হতে এখনও প্রায় ছ’মাস বাকি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কাউন্সিলরদের ক্ষমতা লুপ্ত হওয়ার পর নাগরিকদের পরিষেবা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব কে সামলাবে?
রোজ নানা প্রয়োজন নিয়ে সাধারণ মানুষ কাউন্সিলরদের কাছে যান। বিশেষ করে আয় শংসাপত্র, বাসস্থান শংসাপত্র-সহ বিভিন্ন ধরনের নথি সংগ্রহের জন্য। এছাড়া সার্বিক পরিষেবা রয়েছে। এর জন্য পরিকাঠামো আদৌ প্রস্তুত রয়েছে কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে কলকাতা পুরসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের কাউন্সিলরের সংখ্যা ১৩৫, তাদের মধ্যে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। তা সত্ত্বেও ক্ষমতা হারাতে হল জোড়াফুল শিবিরকে। যদিও পুর বোর্ড হাতে রাখার মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শেষ চেষ্টা ব্যর্থ
গত রবিবার ইএম বাইপাস সংলগ্ন তৃণমূল ভবনে বৈঠক ডেকেছিলেন তৃণমূল নেত্রী। পরে সেই বৈঠক বাতিল হয়ে যায়। এরপরই তিনি দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেন। নতুন মেয়র নির্বাচনের লক্ষ্যে সই সংগ্রহের উদ্যোগ নেন মালা রায়। শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। সেই চিঠি আর জমা পড়েনি। ফলে নবান্নের নোটিসের জবাব দেয়া সম্ভব হয়নি বিদায়ী পুর বোর্ডের পক্ষে।
কেন নির্বাচনের এক মাসের মধ্যে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ডিডাব্লিউকে বলেন, "তৃণমূলের এখন কারোর উপরে কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। পঞ্চায়েত সদস্য থেকে শুরু করে কাউন্সিলর, বিধায়ক, সাংসদদের কেউ আর মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের অংশ হিসেবে নিজেদের চিহ্নিত করতে চাইছেন না। ওরা যদিও বা তৃণমূলের হয়ে থাকতে চাইছেন, সেটা একটা স্বচ্ছ তৃণমূল হিসেবে। কলকাতা পুরসভার ক্ষেত্রে কেউ আর ওই তৃণমূলের হয়ে মেয়র হতে চাইছেন না।"
ইতিমধ্যে কলকাতা পুরসভার পাঁচজন কাউন্সিলর গ্রেপ্তার হয়েছেন। সকলেই তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত।
সিপিএম নেতা ও কলকাতার সাবেক মেয়র বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, "এই কাউন্সিলররা ক্ষমতায় থাকার সময় এত চুরি করেছে যে তারা পালাবার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। তাদের কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন, কেউ জনরোষের ভয়ে এলাকাছাড়া, এই পরিস্থিতিতে তারা পুরসভার কাজ করবেন কীভাবে। তাই পুর বোর্ড ভেঙে দেয়া হয়েছে। ক্ষমতা ছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা বিগ জিরো। ক্ষমতা চলে গেলে ওর দল থাকবে না আগেই বলেছিলাম। সিপিএম বিরোধিতার প্রয়োজনে আরএসএসের মদতে তৃণমূল তৈরি হয়েছিল। সিপিএমের বিরোধিতা করে কিছুদিন ক্ষমতায় ছিল। এখন মমতার প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছে, বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। এই দলের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক কোনো অস্তিত্বই নেই।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, "কয়েকজন কাউন্সিলর এখন জেলে। কয়েকজন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। রাস্তাঘাটে মানুষ তাদের জন্য ডিম হাতে দাঁড়িয়ে থাকছে। তৃণমূলের নানা অন্যায় থেকে এই নেতারা এখন নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছেন। এর সবচেয়ে বড় পথ হচ্ছে পদত্যাগ করা। পদ না ছেড়ে উপায়ও নেই। আর ছ'মাসের মধ্যে নির্বাচন হবে, এত দিন চেটেপুটে খেয়ে কেউ কেউ আবার অন্য দলে ঢুকে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছেন।"
পুর পরিষেবার সমস্যা
কাউন্সিলররা না থাকায় পুর পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষত বর্ষাকালীন নিকাশি থেকে ডেঙ্গু মোকাবিলার ক্ষেত্রে পুরসভার যে ভূমিকা থাকে, তা বিঘ্নিত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও পুর নাগরিকদের অনেকে আবার ভিন্নমত পোষণ করছেন।
পরিবেশকর্মী নব দত্ত ডিডাব্লিউকে বলেন, "কাউন্সিলররা নর্দমা সাফ করতে নামেন না। এই কাজটা সাফাইকর্মীরা করেন। বরং কাউন্সিলররা কিছু সমস্যা তৈরি করেন। গাছ কাটা থেকে পুকুর ভরাটের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। সিস্টেম যদি ঠিক থাকে, তাহলে সব ঠিক চলতে পারে, নির্বাচিত বোর্ড লাগে না। ১৯৭৭ থেকে ৮৫ সাল পর্যন্ত বাম আমলে কলকাতা পুরসভা চলেছে প্রশাসক দিয়ে। তখন তো অসুবিধা হয়নি।"
তার মতে, "তৃণমূলের আমলে মেয়র ও কাউন্সিলররা বোঝা হয়ে গিয়েছিলেন। সাবেক মেয়র ফিরহাদ হাকিম এমন কোনো কাজ করেননি যে তাকে ইতিবাচক বলতে হবে। গত আট বছরে মেয়র কলকাতা শহরে কতগুলো বেঢপ মূর্তি বসানো ছাড়া কী করেছেন? যত্রতত্র রেলিং বসিয়েছেন, বুলেভার্ডের বড় গাছ কেটে দিয়েছেন, গাছে আলো লাগিয়েছেন। সব পরিবেশ বিরোধী কাজ করেছেন।"
এত দুর্নীতির অভিযোগ, নেতাদের বিরুদ্ধে রোষের পাশাপাশি একদা বিশ্বস্ত মমতা সঙ্গীদের এখন দেখা যাচ্ছে বিদ্রোহী তৃণমূল শিবিরে। তাই ফিরহাদকে দেখা গিয়েছে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি পাওয়া ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে।
রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেন, "তৃণমূলের মতাদর্শ বলে কিছু নেই। সিপিএমের অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তারা এসেছিল। নেতিবাচক ভোটের মাধ্যমে জিতেছিল। সুবিধাবাদী একটা দল যাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চুরি, দুর্নীতি, লুট এবং সাধারণ মানুষের উপরে অত্যাচার। ফলে এই দলের নেতা-কর্মীদের সাংগঠনিক বা মতাদর্শগত টান দলের প্রতি নেই। ফিরহাদ হাকিম এত বছরে অনেক বেআইনি নির্মাণে অনুমোদন দিয়েছেন, এই অভিযোগ রয়েছে। যদি তিনি এখন ঋতব্রতর তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত না হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই গোষ্ঠীতে যোগ দিলে কিছুটা ক্ষমতার কাছাকাছিও থাকা যাবে। একদিকে প্রশাসনিক সুরক্ষা পাবেন, অন্যদিকে ক্ষমতার চাহিদাও মিটতে পারে।"