গ্যাস সংকট সামলাতে পারবে ভারত?
১৩ মার্চ ২০২৬
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানির ভাঁড়ারে টান পড়েছে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন কার্যকর করে কেন্দ্র পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এলপিজি-র উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বিরোধীদের দাবি, কঠিন সময়ের মোকাবিলায় বিজেপি সরকার ব্যর্থ।
সংসদে হইচই
লোকসভায় কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশানা করেছে বিরোধীরা। সংসদের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বে লোকসভা ও রাজ্যসভায় জ্বালানি সংকট নিয়ে হইচই করে তারা। তার জেরে লোকসভার কাজ কিছুটা সময়ের জন্য মুলতবি করে দিতে হয়।
সংসদ চত্বরে বিক্ষোভ দেখান বিরোধী সাংসদরা। তারা স্লোগান তোলেন, 'সিলিন্ডার গায়েব, পিএম গায়েব'। বিরতির পরে ফের সংসদের কাজ শুরু হলে অভিনব বিক্ষোভ দেখান তৃণমূলের মহিলা সাংসদরা। মুখ্য সচেতক কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে ছোট হাতা, খুন্তি, কড়াই নিয়ে তারা বাজাতে থাকেন। স্লোগান দেন 'এলপিজি এলপিজি'।
কেন্দ্রের বক্তব্য
বিরোধীদের আক্রমণের সামনে পাল্টা তাদের নিশানা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, "আমি বিরোধীদের নিয়ে কোনো রাজনৈতিক মন্তব্য করব না। এই সময়ে বিরোধিতা করে ওরা নিজেদের স্বরূপ চেনাচ্ছে, দেশের ক্ষতি করছে।"
বিরোধীদের অভিযোগ উড়িয়ে তিনি বলেন, "সব দেশেই এই সংকটের প্রভাব পড়েছে। দেশের স্বার্থ রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি।"
বিরোধীদের অভিযোগের জবাবে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী বলেন, "দেশে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত আছে। পেট্রোল, ডিজেল বা কেরোসিনের অভাব নেই। আমাদের হাতে পর্যাপ্ত পরিশোধিত তেল আছে। গ্যাস ও তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক। সিএনজি ১০০ শতাংশ সরবরাহ হচ্ছে। বুকিং-এর আড়াই দিনের মধ্যে বাড়িতে গ্যাস পৌঁছে যাচ্ছে। যে সমস্যা হচ্ছে তার জন্য বেআইনি মজুতদারি ও কালোবাজারি দায়ী।"
রাজ্যের উদ্যোগ
পশ্চিমবঙ্গ সরকার বৃহস্পতিবার রান্নার গ্যাস নিয়ে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর জারি করেছে। এতে ১০ দফা নির্দেশিকা রয়েছে। এক্ষেত্রে জোর দেওয়া হয়েছে নজরদারির উপরে। যাতে এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে কালোবাজারি না হয়। নবান্নে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এলপিজির জোগান ও সরবরাহের উপরে এখান থেকেই লক্ষ্য রাখা হবে।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় যা বলছে
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুজাতা শর্মা সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন, ''দেশের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। কিন্তু প্যানিক করার দরকার নেই। আগে দিনে ৫৫ লাখ সিলিন্ডার বুক হত। গত কয়েকদিন ধরে হচ্ছে ৭৫ লাখ করে। রিফাইনারিতে ৩০ শতাংশ এলপিজি বেশি উৎপাদন হচ্ছে। বাণিজ্যিক সিলিন্ডার রাজ্য সরকার অগ্রাধিকার বুঝে দেবে। কেরোসিনের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। হোটেল রেস্তোরাঁকে কয়লা দেওয়া হবে।''
সুজাতা শর্মার অনুরোধ, ''আতঙ্কে বুকিং যেন না করা হয়। ঝাঁসিতে এক ট্রাক ভর্তি সিলিন্ডার ডাকাতি হয়েছিল। পুলিশ তা উদ্ধার করেছে। হাপুরে প্রচুর সিলিন্ডার উদ্ধার হয়েছে। কর্নাটকে সিলিন্ডার উদ্ধার করা হয়েছে।''
শিপিং মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জানিয়েছেন, ''তিনজন নাবিক মারা গেছেন। একজন নিখোঁজ। মধ্যপ্রাচ্যে ২৩ হাজার ভারতীয় নাবিক আছেন।''
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে বলা হয়েছে, আমিরাত, কাতার থেকে বিমান চলছে। সৌদি আরবের আকাশসীমা খোলা থাকছে। বাহরিনে গালফ এয়ারের ফ্লাইট চলছে। তবে কুয়েতের আকাশসীমা বন্ধ। সৌদি থেকে তাদের অপারেশন চলছে। শুক্রবার ম্যাসকটে হামলা। দুইজন ভারতীয় মারা গেছেন। ১১ জন আহত। পাঁচজন চিকিৎসাধীন।
বিদেশনীতির প্রশ্ন
ইরান ও আমেরিকার চলতি সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত যে বিদেশ নীতি অনুসরণ করছে, তা সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিরোধীদের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির ফলেই জ্বালানি সংকট তীব্র হচ্ছে।
লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এমনই অভিযোগ তুলেছেন। তার কথায়, "জ্বালানি সংকট সবে শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ভুল নীতির জন্য আগামীতে আরো খারাপ দিন আসতে চলেছে। ভারত কোন দেশ থেকে জ্বালানি কিনবে, কতটা কিনবে, সেটা আমেরিকা কেন ঠিক করবে?"
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
চলতি সমস্যার প্রভাব অর্থনীতি ও পররাষ্ট্র নীতিতে পড়ছে। দুটো দিক সামাল দেয়া মোদীর কাছে চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার ডিডাব্লিউকে বলেন, "বর্তমানে দেশে যে অর্থনৈতিক সংকট চলছে তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই এবং কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত এই সত্যটি মেনে নেওয়া। এই সংকট কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম-সহ বিশ্বজুড়েই এর প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই কঠিন সময়ে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে বিরোধীদের উচিত কেন্দ্রের সঙ্গে আরো সহযোগিতামূলক আচরণ করা, আবার কেন্দ্রের উচিত সংকীর্ণ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা।"
যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে অপরিশোধিত তেল বহনকারী ট্যাঙ্কার ভারতে আসে, সেই এলাকায় এখন যুদ্ধের আওতায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে বৃহস্পতিবার প্রথম দুটি ট্যাংকার মুম্বইয়ে এসে পৌঁছেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ এবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর ইঙ্গিত দিয়েছে, আপাতত তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল করলে তাকে নিশানা করা হতে পারে। এই পথে প্রতিদিন ২৫ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ভারতে আসে। এখন যা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত ডিডাব্লিউকে বলেন, "ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং অত্যন্ত গভীর। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইরান স্পষ্ট করেছে যে, কোনো জাহাজে ভারতের জাতীয় পতাকা থাকলে তারা তাতে আক্রমণ করবে না এবং নিরাপদে যাতায়াত করতে দেবে। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইরান বরাবরই বড় ভূমিকা পালন করে আসছে এবং বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ভারত সেখান থেকে প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহ করেছে। বর্তমান সংঘাতের আবহে ভারতের মূল লক্ষ্য হলো শান্তি বজায় রাখা এবং সব পক্ষ যাতে সংযম প্রদর্শন করে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসে সেই প্রচেষ্টা করা।"
ভারত কি অ্যামেরিকার দিকে ঝুঁকে পড়ছে?
অভিরূপের বক্তব্য , "ভারতের উচিত ছিল অ্যামেরিকার উপরে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের একটি মধ্যপন্থা অবলম্বন করা, যা সাধারণ মানুষের জন্য উপকারী হতো। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার ডনাল্ড ট্রাম্পের নীতির দ্বারা বড্ড বেশি প্রভাবিত, যার পেছনে বড় শিল্পপতিদের আমেরিকায় বিশাল বিনিয়োগ একটি বড় কারণ হতে পারে। জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে এই ধরণের একপাক্ষিক নীতি পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবি।"
যদিও শ্রীরাধা দত্ত কিছুটা ভিন্নমত। বলেন, "বর্তমান সরকারের আমলে গত ১০ বছরে পশ্চিম এশিয়ার দেশ, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি বা অন্য দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভারত একই সঙ্গে ইজরায়েলের কাছ থেকে উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং নজরদারি প্রযুক্তি সংগ্রহ করে নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করছে, আবার ফিলিস্তিন ইস্যুতেও নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেছে। ভারত কখনোই রাষ্ট্রপুঞ্জে ফিলিস্তিনের বিপক্ষে ভোট দেয়নি এবং সবসময়ই 'টু স্টেট সলিউশন' বা দুই রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষেই মত দিয়েছে।"
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী ডিডাব্লিউকে বলেন, "ট্রাম্পমুখি নীতি হলে আমাদের উপরে শুল্কের বোঝা চাপত না। মোদীর সঙ্গে ট্রাম্পের একটা সখ্য তৈরি হয়েছে। সেই কারণে আশা করা হয়েছিল কিছু সুবিধা আমরা পাব। কিন্তু সেটা হয়নি। বাংলাদেশ সম্পর্কে অ্যামেরিকার ভূমিকা নিয়েও একই কথা বলা যায়। ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কাজে আসেনি।"
ভারসাম্যের উপরে জোর দিয়ে শ্রীরাধার বক্তব্য, "বিশ্বমঞ্চে ভারতের নিজের স্বার্থ এবং সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েই চলতে হয়। সভ্যতার প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ের বাণিজ্য, সব ক্ষেত্রেই ভারত ইরানের সঙ্গে তার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতের এই ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি আন্তর্জাতিক সংকটের সময়েও নিজেদের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম হবে।"