1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

তৃণমূল নেতাদের বাড়ি বিপুল পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার

৮ জুন ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পরে ব্যাপক ধরপাকড় চলছে। বিভিন্ন জায়গায় উদ্ধার হচ্ছে ত্রাণের সামগ্রী।

https://p.dw.com/p/5F1Le
কেন্দ্রীয় স রকারের বিরুদ্ধে কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের মিছিল। ফাইল ছবি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের দলের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে ত্রাণ সামগ্রী আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। ছবি: Satyajit Shaw/DW

সাবেক তৃণমূল সরকারের নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের বাড়ি হানা দিয়ে পাওয়া গিয়েছে ত্রিপল-সহ অন্যান্য জিনিস।

ত্রাণসামগ্রী লোপাট করার অভিযোগে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ দেখাচ্ছে জনতা। একাধিক তৃণমূল নেতা, জনপ্রতিনিধি ও দলীয় কার্যালয়কে ঘিরে বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে।

ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার

নদিয়ার নবদ্বীপে একটি ক্লাবঘর থেকে সরকারি ত্রাণসামগ্রী উদ্ধার হয়। এর মধ্যে তাঁবু, ত্রিপল, পোশাক-সহ বিভিন্ন সামগ্রী ছিল। উদ্ধার হওয়ার পরে নবদ্বীপ পুরসভার চেয়ারম্যান বিমানকৃষ্ণ সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সামগ্রী উদ্ধার করে। 

গভীর রাতে বিমানকৃষ্ণ সাহাকে আটক করে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনায় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী সৌরভ সাহাকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দুজনকই পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছে আদালত।

পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলী উত্তরের সাবেক তৃণমূল বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে পুলিশি অভিযানে বিপুল পরিমাণ ত্রিপল, কম্বল, খেলাধুলোর সামগ্রী উদ্ধার করে। ত্রাণের জন্য কেনা হলেও এসব বণ্টন করা হয়নি বলে অভিযোগ। এখানেও জনতা বিক্ষোভ দেখায়।

কলকাতার পঞ্চসায়রের একটি তৃণমূল পার্টি অফিস থেকে সরকারি চিহ্নযুক্ত ত্রাণসামগ্রী, অক্সিজেন সিলিন্ডার, ত্রিপল, তাঁবু উদ্ধার হয়। কলকাতা পুরসভার চিহ্ন সম্বলিত বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার হওয়ার খবর সামনে আসে। তুমুল উত্তেজনা তৈরি হয় এলাকায়।

উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়া পুরসভার চেয়ারম্যান, তৃণমূল নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের ডেরায় তল্লাশি চালিয়ে প্রায় চার হাজার সরকারি ত্রিপল, কম্বল-সহ বিপুল ত্রাণসামগ্রী উদ্ধারের দাবি করে পুলিশ। তদন্তকারীরা পরে নগদ অর্থও উদ্ধারের কথা জানান। অভিযোগ, দুর্যোগ-পীড়িত মানুষের জন্য নির্ধারিত সামগ্রী বিতরণ না করে মজুত করে রাখা হয়েছিল। দীপঙ্করকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পশ্চিম বর্ধমানের জামুরিয়ার কয়লা খনি এলাকায় ইসিএলের একটি তালাবন্ধ কোয়ার্টার থেকে প্রচুর পরিমাণে ত্রিপল, কম্বল, চাল ও গম উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়, ওই কোয়ার্টারটি এক তৃণমূল নেতার।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার মন্দিরবাজারে তৃণমূল বিধায়ক জয়দেব হালদারের দলীয় কার্যালয়ের পাশের একটি গোডাউনে ত্রাণসামগ্রী মজুত করে রাখার অভিযোগে জনতা বিক্ষোভ দেখায়। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে প্রকৃত উপভোক্তাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ না করে সেগুলি গুদামে আটকে রাখা হয়েছিল। 

উত্তেজিত জনতা গোডাউনের দরজা খুলে ভিতরে থাকা ত্রাণসামগ্রী বাইরে বার করে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। পরে গুদামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এই জেলারই রায়দিঘির নন্দকুমারপুর এলাকার ক্লাব মোড়ে তৃণমূল নেতা উত্তম মান্নার কার্যালয় থেকে প্রচুর ত্রাণসামগ্রী উদ্ধার করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সেগুলি উদ্ধার করে পরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়।

ডায়মন্ডহারবার দুই ব্লকের প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা রাজু বাগ শনিবার তার বাড়ির তালা ভেঙে পুলিশ ৫০ হাজার ত্রিপল উদ্ধার করেছে। ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে রাজু ও তার ভাই এলাকাছাড়া।

এই মহকুমা এলাকার কেল্লার মোড় সংলগ্ন এলাকায় এক তৃণমূল নেতার হোটেল থেকেও বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী ও জলের পাইপ উদ্ধার হওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিজেপি নেতারা স্থানীয় মানুষ ও পুলিশকে নিয়ে ওই হোটেলে যান।

ডায়মন্ডহারবার মহকুমার সরিষা-সহ বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল নেতার হোটেল, পার্টি অফিস এবং গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী উদ্ধারের অভিযোগ সামনে আসে।

সাতগাছিয়া বিধানসভার কৃপারামপুরে তৃণমূল নেতা নবকুমার বেতাল এবং তার স্ত্রী সোমাশ্রী বেতালের বাড়ি থেকে ২০২০ সালের ত্রাণসামগ্রী পাওয়া যায় বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়রা বাড়ির দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে বস্তাবন্দি সামগ্রীর পাশাপাশি হাঁড়ি, কড়াই, গামলাসহ বিভিন্ন জিনিস দেখতে পান। সোমাশ্রী এবারের ভোটে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন।

ঝাড়গ্রামের দহিজুড়িতে সাবেক এক তৃণমূল অঞ্চল সভাপতির বাড়ি ও পরে এক তৃণমূল নেতার বাড়ির সামনে থাকা একটি গাড়ি থেকে কম্বল, শাড়ি-সহ সরকারি ত্রাণসামগ্রী ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র উদ্ধার হয়।

কীভাবে ত্রাণ বণ্টন

বিধায়কদের কাছে বিভিন্ন সময়ে ত্রাণের সামগ্রী আসে। কখনো আসে উৎসবকালীন পোশাক। বর্ষাকালে ত্রিপল, পলিথিন, শীতকালে গরম জামা আসে সরকারের পক্ষ থেকে। এছাড়া পুজো, ঈদে নতুন পোশাক বরাদ্দ করা হয়। এসব বিধায়করা নিজেরা বিলি বণ্টন করেন না। তারা সংশ্লিষ্ট জেলাশাসককে চিঠি লেখেন। জেলাশাসকের দপ্তর টেন্ডার ডেকে বণ্টনের দায়িত্ব দেন। এর মধ্যেই কোনো এক পর্যায়ে ঢুকে পড়ে রাজনৈতিক প্রভাব।

একইভাবে গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে ত্রাণের সামগ্রী পাঠানো হয়। জেলা পরিষদের সভাধিপতি, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির জন্য এসব সামগ্রী বরাদ্দ করা হয়। তারা পঞ্চায়েত প্রধানের মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় সেসব বিতরণ করেন।

কেশপুরের তৃণমূল বিধায়ক, সাবেক মন্ত্রী শিউলি সাহা ডিডাব্লিউকে বলেন, "আমরা আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য ৪০-৫০ টা ত্রিপল, পলিথিন রেখে দিই। সেটা বিশেষ পরিস্থিতিতে বিলি করা হয় দুর্গত মানুষদের মধ্যে। তাই কারো বাড়ি থেকে ২০, ৩০, ৫০টা পলিথিন পাওয়া গেলে সেটাকে অনৈতিক বলা যাবে না। কিন্তু কারো হেফাজত থেকে যদি বাড়তি বা অনেক বেশি সামগ্রী পাওয়া যায় যা বিলি করা হয়নি, সেটা অনৈতিক। কিন্তু এই দুটোকে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে।"

জনরোষ ও হেনস্থা

বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূল নেতাদের গ্রেপ্তারির পরে শুনতে হচ্ছে চোর স্লোগান, কোথাও ছোড়া হচ্ছে ডিম। 

শিউলি বলেন, "পঞ্চায়েত প্রধানের অফিসে একটা স্টোর রুম থাকে যেখানে ত্রাণের সামগ্রী গচ্ছিত রাখা হয়। সেখানে ত্রিপল পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু যদি প্রধানের বাড়িতে বস্তা বস্তা চাল পাওয়া যায়, সেটা স্বাভাবিক নয়। তবে কে সত্যি অন্যায় করেছে, সেটা বিচার হওয়ার আগে সামাজিকভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে। তার পরিবার, সন্তানেরা এর ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ছেন, এটা কাম্য নয়।"

সিপিএম নেতা ও বিধানসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী, অধ্যাপক পার্থপ্রতিম বিশ্বাস ডিডাব্লিউকে বলেন, "যেসব ত্রাণ সামগ্রী আর্ত, দুঃস্থ মানুষদের জন্য বরাদ্দ, সেটাও চুরি করা হয়েছে, এই নমুনা আমরা পালাবদলের পরে রোজ দেখতে পাচ্ছি। এসব জিনিস বিলি না করে ঘরবন্দি করে রাখা হয়েছিল। এই দুর্নীতি নিচুতলায় অগোচরে থাকতে পারে, কিন্তু সাবেক বিধায়ক, চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে এই ঘটনা শুধু তাদের পক্ষে লজ্জার নয়, এটা গোটা রাজ্যের লজ্জা। এই বিষয়টা আমাদের বিড়ম্বনায় ফেলেছে।"

বিভিন্ন নেতা ও কর্মীদের গ্রেপ্তারির পরে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে সোশ্যাল ট্রায়াল নিয়ে।

সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে মব ভায়োলেন্সকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। এটা অতীতে সরকার পরিবর্তনের সময় হয়নি। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পরে কংগ্রেসের নেতাদের এভাবে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে বাম নেতাদের এমন ধরপাকড় হয়নি। তাহলে এবার হচ্ছে কেন? তবে কি ধরে নিতে হবে তৃণমূলের সব নেতাই চোর? নেতাদের প্রকাশ্যে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানো হচ্ছে। এটা কী ধরনের সংস্কৃতি? ইতিমধ্যে কলকাতা হাইকোর্ট এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছে।"

বিজেপি মুখপাত্র সায়ন্তন বসু ডিডাব্লিউকে বলেন, "এই পরিস্থিতি কাম্য না হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূলের অনাচার। তৃণমূল গত ১০-১৫ বছর এত অত্যাচার করেছে যে মানুষ আর অপেক্ষা করছে না। তাদের যে পুঞ্জীভূত রাগ, সেটারই প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গে যে রাজনৈতিক হিংসার অতীত রয়েছে, তার সঙ্গে আজকের পরিস্থিতি তুলনীয় নয়। বিজেপি সরকার রয়েছে বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।"

ডয়চে ভেলের কলকাতা প্রতিনিধি পায়েল সামন্ত৷
পায়েল সামন্ত ডয়চে ভেলের কলকাতা প্রতিনিধি৷