পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে আরজি কর নিয়ে আলোচনা নেই কেন?
১৯ এপ্রিল ২০২৬
২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আরজি কর হাসপাতালে ধর্ষণ ও খুন করা হয় এক নারী চিকিৎসককে৷ এই ঘটনার প্রতিবাদে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে যা ছিল মূলত অরাজনৈতিক৷ সেই আন্দোলনের কোনো রেশ দেখা যাচ্ছে না পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে৷ নিহত ডাক্তারের মা বিজেপিতে যোগ দেয়ায় কি এই পরিস্থিতি?
নির্বাচনে নন-ইস্যু
নাগরিক সমাজ ও জুনিয়র চিকিৎসকদের নেতৃত্বে আরজি কর আন্দোলন গড়ে উঠেছিল৷ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন৷ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব এই আন্দোলন থেকে দূরে ছিলেন, কেউ কেউ চেষ্টা করলেও আন্দোলনকারীরা রাজনীতিকদের প্রবেশে বাধা দিয়েছেন৷
আরজি করের নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদ দেখা গিয়েছে রাজ্য ও দেশ এবং দেশের বাইরে৷ এই ঘটনার মাত্র দুবছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট হচ্ছে৷ কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচারে সেই ঘটনার ব্যাপারে বিশেষ কথা শোনা যাচ্ছে না৷ নারী সুরক্ষা নিয়ে বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু কথা বলা হলেও চিকিৎসক হত্যার বিরুদ্ধে সেই জোরালো আবেগ বা ক্রোধের ছিটেফোঁটা কি দেখা যাচ্ছে?
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাদ মাহমুদ ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘নারী সুরক্ষা, দুর্নীতি, চাকরির অভাব- এগুলি সবই পশ্চিমবঙ্গের জ্বলন্ত বিষয়৷ কিন্তু এখনো খবরের শিরোনামে এসআইআর৷ এটাই সব বিষয়কে চাপা দিয়ে দিয়েছে৷''
জুনিয়র চিকিৎসকদের নেতৃত্বে আরজি কর আন্দোলন ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল৷ তাদের অন্যতম মুখ অনিকেত মাহাতো ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আরজি কর আন্দোলন একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন যেখানে মানুষের মৌলিক দাবি ও ব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে৷ অন্যদিকে, নির্বাচন হলো কেবল ক্ষমতায় আসার লড়াই, যেখানে জনস্বার্থের চেয়ে জয়-পরাজয় ও রাজনৈতিক কৌশল বেশি গুরুত্ব পায়৷ স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও স্বাস্থ্যব্যবস্থার মতো মৌলিক সমস্যার সমাধান হয়নি৷ নির্বাচনে প্রার্থীরা নানা লোকদেখানো কাজ (মশলা বাটা বা ঘর মোছা) করে ভোট পাওয়ার চেষ্টা করেন, যা আসলে মানুষের সমস্যা সমাধানের প্রকৃত পথ নয়৷ গণআন্দোলন মানুষের মধ্যে নৈতিকতা ও ত্যাগের মানসিকতা তৈরি করে৷ উদাহরণস্বরূপ, আর জি কর আন্দোলনে সাধারণ মানুষ তাদের শেষ সম্বলটুকুও তুলে দিয়েছেন, যা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচারের ক্ষেত্রে দেখা যায় না৷''
রাজনীতিতে যোগ
নিহত চিকিৎসকের মা অরাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন৷ মেয়ের হত্যার বিচারের দাবিতে তিনি মিছিলে হেঁটেছেন৷ আদালতে প্রধান অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত ও সাজাপ্রাপ্ত হলেও তারা এই বিচারে খুশি নন৷
নির্বাচনের ঠিক আগে নিহত চিকিৎসকের মা যোগ দেন বিজেপিতে৷ তিনি এবার উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি কেন্দ্রে পদ্ম টিকিটে প্রার্থী৷ প্রচার শুরু করে দিয়েছেন৷ তার দাবি, মেয়ের হত্যার সুবিচারের আশায় তিনি রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন৷
এই আন্দোলনের সঙ্গে যে সিনিয়র চিকিৎসকরা যুক্ত ছিলেন, তাদের অন্যতম অংশুমান মিত্র৷ তিনিও নির্বাচনি ময়দানে রয়েছেন৷
জোড়াসাঁকো কেন্দ্রে এসইউসি প্রার্থী অংশুমান ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আরজি কর আন্দোলন চিকিৎসকের মা শুরু করেননি৷ তিনি কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিলেন বলে আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে না৷ কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার এই তদন্তকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে, এটা উনি বুঝতে পারেননি৷ এত কিছুর পরেও উনি ভরসা রেখেছেন কেন্দ্রের শাসক দলের প্রতি, এই ভরসা রাখার অধিকার তার আছে৷ এতে আন্দোলনের ক্ষতি হবে না৷ কোনো একটি রাজনৈতিক দলের আন্দোলন এটা নয়। ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে সংগ্রাম চলবে৷''
অনিকেত বলেন, ‘‘মানুষের স্মৃতি ক্ষণস্থায়ী নয়৷ সাধারণ মানুষ স্পষ্ট বোঝেন যে রাজ্য সরকার তথ্যপ্রমাণ লোপাট বা তদন্তে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং সিবিআই বা বিচার ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও তাদের মনে ক্ষোভ রয়েছে৷ তবে অভয়ার মায়ের নির্বাচনে লড়া বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমাধান হতে পারে না৷ গণতান্ত্রিক কাঠামো বা বিচার ব্যবস্থা সচল থাকলে কাউকে বিচার পাওয়ার জন্য ভোটে দাঁড়াতে হত না৷ সন্তানহারা বাবা-মায়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু তাদের চরিত্র হনন বা অশালীন মন্তব্য করা অনুচিত৷''
নির্বাচনে প্রভাব
আরজি করের উত্তাল গণআন্দোলনের পরে প্রথম নির্বাচন হয় ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর৷ রাজ্যের ছয়টি বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়৷ কোচবিহারের সিতাই, আলিপুরদুয়ারের মাদারিহাট, বাঁকুড়ার তালড্যাংরা, পশ্চিম মেদিনীপুরের মেদিনীপুর, এবং উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটি ও হাড়োয়ায় নির্বাচন হয়৷ সব আসনে জয় পায় তৃণমূল৷
অংশুমান বলেন, ‘‘এই নির্বাচনে শুধু আরজি কর নয়, অন্যান্য আন্দোলনের প্রভাব পড়বে৷ আশা কর্মী থেকে শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলনের ছাপ দেখা যাবে৷ আরজি কর আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে বলতে পারি, শুধু এই ভোট নয়, এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী৷ এই আন্দোলন থেকেই জন্ম হয়েছে অনিকেত মাহাতোর মতো নেতার৷ তারা আগামী দিনে এগিয়ে চলার পথ দেখাবেন৷ এটা ভোট রাজনীতির আন্দোলন নয়, এটা সত্যের পক্ষে লড়াই৷''
তার মতে, ‘‘আরজি কর আন্দোলন থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করেছিল৷ কিন্তু তারা সেটা পারেনি৷ তারা আন্দোলনকে নানাভাবে বিপথগামী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷ কিন্তু সফল হবে না৷'‘
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
রাজনীতির আবর্তে জড়িয়ে গেলে কতটা ক্ষতি হতে পারে আন্দোলনের?
অধ্যাপক মাহমুদ বলেন, ‘‘চিকিৎসকের মা বিজেপির প্রার্থী হয়ে গেলেন, এতে তৃণমূলের রাজনৈতিক চক্রান্তের অভিযোগ বৈধতা পেয়ে গেল৷ তিনি যদি এর বদলে তৃণমূলকে হারানোর ডাক দিতেন? অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও এটা আমরা দেখেছি৷ যখন তারা বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন, তখন পুরো বিষয়টার নৈতিক জোর কমে যাচ্ছে৷ আরজি কর আন্দোলন শুধু নারীর সুরক্ষা নয়, দুর্নীতি, থ্রেট কালচার, হাসপাতালে অব্যবস্থা, এই সবকিছু নিয়ে পতাকাবিহীন আন্দোলন হয়েছিল৷ সিঙ্গুর এমন পতাকাবিহীন আন্দোলন হয়েছিল, পরে তার রাজনৈতিক ফসল তুলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷''
সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্র ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘এটা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল৷ এটার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আছে৷ চিকিৎসকের মা মনে করেছেন, তিনি ওই দলে গেলে বিচার পাবেন৷ ওর অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে৷ এবার এসআইআর সব ইস্যুকে পিছনে ফেলে দিয়েছে৷ এতে বিজেপির সুবিধা হবে না, অসুবিধাই হবে৷ তবে শুধু ভোট দিয়ে আরজি কর আন্দোলনকে মাপা যাবে না৷ এটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্মৃতিতে থেকে যাবে৷ ভোটে প্রভাব পড়ুক বা না পড়ুক, নির্বাচন সমাজকে বোঝার একটা মাপকাঠি৷ কিন্তু একমাত্র মাপকাঠি নয়৷