বাংলাদেশ নিয়ে মন্তব্যের জন্য আসামের মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা
১ মে ২০২৬
বৃহস্পতিবার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ান বঢ়েকে তলব করে প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ৷
১৫ এপ্রিল এবিপি নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, ‘‘যখন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কে অবনতি হয়, তখন আমার ভালো লাগে৷ কারণ যখন সম্পর্ক ভালো থাকে, তখন ভারত সরকার পুশব্যাক চায় না৷ তাই যখন দু'দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন চলে, সেটাকে আসামের মানুষ পছন্দ করে৷ যখন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকে, তখন সবটা ঢিলেঢালা হয়ে যায়৷''
আসামের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি সবসময় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নত না হয়৷ সেক্ষেত্রে বিএসএফ ও সেনা সীমান্তে পাহারায় থাকে৷ তার ফলে অনুপ্রবেশকারীরা বাংলাদেশ থেকে আসতে পারে না৷ যখন সম্পর্ক ভালো থাকে, সেই সময়টা আসামের কাছে উদ্বেগের৷''
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রসঙ্গ টেনে আনেন হিমন্ত৷ তিনি বলেন, ‘‘ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, ইউনূসের সময় যে পরিস্থিতি ছিল, সেটাই যেন এখন থাকে৷''
ভারতীয় বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইমনকল্যাণ লাহিড়ী ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘রাজনৈতিক দলগুলো যা বলছে, সেগুলো একেবারে দেশীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বলছে৷ এই বাংলাদেশি ইস্যু ইত্যাদি, এগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ যে আইনগুলো রয়েছে, যেমন বর্ডার সিকিউরিটি ল, মাইগ্রেশন ল, সিএএ, এনআরসি, এগুলো তো আইনের মতো চলবে, আইনের পথেই চলবে৷''
অধ্যাপক লাহিড়ী বলেন, ‘‘কোনো দেশ বা একটি দেশের নাগরিকদের সম্পর্কে বার্তা দেয়া ভারতীয় সংবিধানের বিরোধী৷ এটা কারো ব্যক্তিগত মতামত, যা সার্বিকভাবে বিদেশনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে না বা ফেলবেও না৷''
সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ৷ এর আগে অমিত শাহর মন্তব্যের সময় শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন৷ তারপরে বহুদিন ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক তিক্ত থেকেছে৷ তারেক রহমান নতুন সরকার তৈরি করার পরে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার দিকে যাচ্ছে৷ সেই সময়ে এই হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক৷ তিনি অনেক সময়ই ভারতের মুসলমানদের নিশানা করে বিভিন্ন কথা বলেন৷ কিন্তু তার মাথায় রাখা উচিত ছিল যে বাংলাদেশে যখন নতুন সরকার এসেছে এবং নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা চলছে, তখন তার কোনো মন্তব্য যেন সেই সম্পর্ককে বিষিয়ে না দেয়৷ আমার মনে হয় ভারতের যে কোনও রাজনীতিবিদেরই এটা মাথায় রাখা উচিত৷''
তিনি বলেন, ‘‘কেউ যদি ছোট দলীয় স্বার্থের জন্য দেশের স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করেন, ভারতকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিপদে ফেলে দেন, তাহলে সেটা ঠিক হবে না৷ বিজেপির অনেক নেতাই নিজের ছোট আঞ্চলিক স্বার্থ দেখতে গিয়ে বা আঞ্চলিক ভোট রাজনীতিতে নিজেকে ভাসিয়ে রাখতে গিয়ে এই ধরনের ভুল করেন৷ হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ সেই ভুল করবেন, এটা আমি আশা করিনি৷ তিনি যে সাম্প্রদায়িক কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন, সেই ফ্লোতেই হয়তো এই কথাটাও বলে দিয়েছেন যেটা বাংলাদেশকে ক্ষুণ্ণ করেছে৷ বিশেষ করে যখন তারেক রহমান আসার পরে যেখানে নয়াদিল্লি এবং ঢাকার মধ্যে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা শুরু হয়েছে৷''
দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘দুটো দেশের পারস্পরিক সম্পর্কটা এতটা ঠুনকো নয় যে কে কী বললেন, তার ফলে সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যাবে৷ পাকিস্তানে প্রতি মুহূর্তেই বিভিন্ন মানুষ ভারত-বিরোধী কথা বলছে, তাদের কেউ কেউ মন্ত্রীও বটে৷ সেইগুলোতে খুব একটা এদিক-ওদিক হয় না৷''
ভারতে এখন নির্বাচনের মৌসুম৷ আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ভোট হয়েছে তামিলনাড়ু, কেরল ও পুদুচেরিতে৷ আসামের ভোট মিটে যাওয়ার পরে সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হিমন্ত পশ্চিমবঙ্গেও প্রচার করেছেন৷
তার মন্তব্য সম্পর্কে অধ্যাপক রাজাগোপাল বলেন, ‘‘এসব বক্তব্যের অনেক সময় পলিটিক্যাল অডিয়েন্স থাকে, তাদের অ্যাড্রেস করেই বলা হয়৷ পরে আবার দু'দেশের বৈঠকে জানিয়ে দেয়া হয়, ওসব কথা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বলা৷ বিশেষত যখন নির্বাচন থাকে তখন এ ধরনের কথা বেশি বলা হয়৷ তাই আসামের মুখ্যমন্ত্রী কী বললেন, তাকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক গুরুত্ব দেয় না৷''