মামলা করলো খেতমজুর সংগঠন, রায়ের পর লাভ পাচ্ছে তৃণমূল?
২৯ অক্টোবর ২০২৫
একশ দিনের কাজ বা মহাত্মা গান্ধী রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি প্রকল্প চালু হয় কংগ্রেস আমলে। বিজেপি সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পরে প্রকল্প চালু রেখেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্প গত চার বছর থমকে গিয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টের রায়
এই রাজ্যে একশ দিনের প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তার ভিত্তিতে গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে এই প্রকল্পের টাকা দেয়া বন্ধ করে দেয়। কাজ করেও টাকা পাননি প্রায় ৬০ লক্ষ শ্রমিক। এ নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের শেষে সোমবার সুপ্রিম কোর্টে ধাক্কা খেয়েছে কেন্দ্র।
কেন্দ্রকে পশ্চিমবঙ্গের ১০০ দিনের কাজের টাকা মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এরপরে এই সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মামলার শুনানি বাকি রয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে। মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র ডিভিশন বেঞ্চে দ্রুত মামলার শুনানির আবেদন করেন খেতমজুর সংগঠনের আইনজীবীরা। ৭ নভেম্বর মামলার শুনানি হতে পারে।
গত ১৮ জুন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছিল, পয়লা অগস্ট থেকে পশ্চিমবঙ্গে ১০০ দিনের কাজ শুরু করতে হবে। কিন্তু কেন্দ্র এই নির্দেশের বিরুদ্ধে ৩১ জুলাই সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে। সোমবার বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ জানায়, হাইকোর্টের নির্দেশে হস্তক্ষেপ করবে না সুপ্রিম কোর্ট।
প্রকল্পের উপযোগিতা
একশ দিনের কাজ প্রকল্পকে একটি আইনের মাধ্যমে অধিকারে পরিণত করা হয়েছিল। গোটা বছরে একশ দিন কাজ পাওয়ার অধিকারী শ্রমজীবী মানুষ। কাজ না পেলে ভাতা দেয়ার সংস্থান আছে আইনে।
এই প্রকল্পের কেন্দ্রীয় পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে এক কোটির বেশি মানুষ একশ দিনের কাজ করে উপার্জন করেছেন। যদিও তারা বছরে মাথাপিছু গড়ে ৫০ দিনের বেশি কাজ পাননি। মজুরি ছিল দৈনিক ২০০ টাকার মতো।
এই বিপুল সংখ্যক মানুষের রোজগার বন্ধ হয়ে গিয়েছে ২০২২ সাল থেকে। এর বিরুদ্ধে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা খেতমজুর ইউনিয়ন মামলা করে। এই মামলায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার দুটি পক্ষ হিসেবে যুক্ত ছিল।
রায়ের প্রতিক্রিয়া
বিজেপি বাংলার মানুষের রোজগারের পথ বন্ধ করে দিয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে গত তিন বছর ধরে প্রচার চালিয়েছে তৃণমূল। সুপ্রিম কোর্টের রায় আসার পরে তারা এ নিয়ে আক্রমণ করেছে বিজেপিকে।
তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জব কার্ড হোল্ডারদের দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। পরে রাজ্য সরকার বিকল্প হিসেবে কর্মশ্রী প্রকল্প চালু করে। অভিষেক সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, "এই রায় বাংলার মানুষের জয়। বিজেপি রাজনৈতিক ভাবে পরাজিত হয়ে অর্থনৈতিক ভাবে পশ্চিমবঙ্গকে বঞ্চিত করার কৌশল নিয়েছিল।"
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, "শুধু চারটি জেলায় ৬১৩ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছিল। এই কারণে হাইকোর্টের রায় নোডাল অফিসার নিয়োগের কথা বলা হয়।"
একশ দিনের কাজ প্রকল্পে যে দুর্নীতি হয়েছিল তা কেন্দ্রীয় তদন্তে উঠে এসেছে। পঞ্চায়েত মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, "১৯টি জেলায় কেন্দ্রের নির্দেশে ১৪টি কেন্দ্রীয় দল এবং ৩৩টি জাতীয় পর্যায়ের মনিটরিং টিম পরিদর্শনে এসেছিল। তারা প্রায় ছয় কোটি টাকা 'রীতি অনুসারে ব্যয় হয়নি' বলে চিহ্নিত করেন। পরে রাজ্যের অডিটে আরও প্রায় দুই কোটি টাকার অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে।"
তিনি বলেন, "৭৮ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যে টাকা অনিয়মে খরচ হয়েছিল, তা উদ্ধার করে কেন্দ্রকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। আমরা দায় এড়াইনি। তা সত্ত্বেও আমাদের টাকা আটকে রেখেছে। গত তিন বছরে এই প্রকল্পে মোট বকেয়া ৫০ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা।”
গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষতি
অর্থনীতিবিদ রতন খাসনবিশ ডিডাব্লিউকে বলেন, "আমরা দেখেছি পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে মানুষ দলবদ্ধভাবে কাজের জন্য বাইরে চলে গিয়েছিলেন। তাদের অনেকেই বলেছিলেন যে কাজের অভাবে তারা গ্রামছাড়া হয়েছেন। কাজ থাকলে নিশ্চয়ই তারা গ্রামে ফিরে আসবেন। একশ দিনের কাজ যদি সে সময় চালু থাকতো, অন্য রাজ্যে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে দুর্ভোগে কম পড়তে হত।"
তিনি ব্যাখ্যা করেন, "গ্রামের মানুষের বছরের একটা বড় সময় কাজ থাকে না। তারা আশেপাশের শহরে গিয়ে কাজ খোঁজার চেষ্টা করেন অথবা গ্রামে বসে থাকেন। এই ছবি পশ্চিমবঙ্গেরও। একশ দিনের কাজ প্রকল্প শুরু হওয়ার পরে তার প্রভাব গ্রামীণ অর্থনীতিতে পড়ছিল। প্রকল্প মারফত যে টাকা ঢুকছিল, তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ভারতে এটাই একমাত্র প্রকল্প যা চাহিদা নির্ভর অর্থাৎ কাজ চাইলে কাজ দিতেই হবে। বাকি সবই যোগান নির্ভর। এই প্রকল্প হওয়ার ফলে গ্রামের মানুষ ইচ্ছে করলেই কাজ পেতে পারতেন। তাই ১০০ দিনের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া গ্রামীণ মানুষের কাছে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল বটেই।"
রাজনীতিতে প্রভাব
প্রবীণ সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্র ডিডাব্লিউকে বলেন, "তামিলনাড়ুর শিক্ষাখাতে যে টাকা আটকে গিয়েছিল, সেই টাকা সুপ্রিম কোর্ট দিয়ে দিতে বলেছিল সপ্তাহ দুয়েক আগে। তখনই বোঝা গিয়েছিল যে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এরকম কিছু একটা ঘটতে চলেছে। কোনো দুর্নীতি হয়ে থাকলে সেটা তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু টাকা বন্ধ করে দেয়া মানে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে এটা করা হয়েছিল সেটা ব্যাহত করা। একশ দিনের কাজের সঙ্গে সরাসরি নাগরিকদের সম্পর্ক। দুর্নীতি তো নাগরিকরা করেননি। তাহলে তারা কেন বঞ্চিত হবেন? এ রায় স্বাগত জানানোর মতোই। অনেকদিন আগেই এটা হওয়া উচিত ছিল।"
তৃণমূল মুখপাত্র মৃত্যুঞ্জয় পাল ডিডাব্লিউকে বলেন, "তৃণমূল বারবার বলেছে, আন্দোলন করেছে। এই টাকা আটকানোর জন্য দায়ী পশ্চিমবঙ্গ বিরোধী বিজেপি। তাদের টাকা দেওয়ার ইচ্ছা থাকলে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গেল কেন? ২০২১-এ হারার পর থেকে ওরা শুধু আমাদের টাকা আটকে রাখেনি, নতুন কাজও বন্ধ করে রেখেছে। এবার হাইকোর্টে আবার যাওয়া হয়েছে, ১০০ দিনের কাজের পুরনো টাকাগুলো সুদসহ ফেরত দিতে হবে।"
তিনি বলেন, "এর জবাবে বাঙালি বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করছে একের পর এক ভোটে। আমাদের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লির বুকে এই আন্দোলন নিয়ে গিয়েছেন। আমাদের নেত্রী রাস্তায় নেমেছেন, বিক্ষোভ দেখানো হয়েছে। যারা বঞ্চিত তাদের আমরা দিল্লি নিয়ে গিয়েছি। আবাস যোজনার টাকাও নিশ্চিত ভাবে পাওয়া যাবে। আমাদের সরকার নিজের থেকে টাকা দিয়েছে বাংলার বাড়ি প্রকল্পে। কেন্দ্র আমাদের থেকে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। মানুষের করের টাকা পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে যদি ফিরিয়ে না দেয়, তাহলে আমরা সেই টাকা আদায় করতে জানি। ২০২৬-এর ভোটে এর উত্তর বিজেপি পাবে।"
২০২৬-এর ভোটে বঙ্গ বিজেপিকে কি চাপে রাখবে আদালতের রায়? শুভাশিস বলেন, "ভোটের এখনো অনেক দেরি আছে। এখন রাজনীতির অর্ধেক দিশানির্দেশ আদালত থেকে আসে। এটা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারও বিশেষ ভাবিত নয়। বিশেষ আন্দোলনও হয়নি সরকারের তরফে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য আন্দোলন করেছিলেন। তারপরে অনেকদিন কেটে গিয়েছে।"
রাজ্য ও কেন্দ্র
খেতমজুর ইউনিয়নের পক্ষে এই মামলার আইনজীবী ছিলেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, "কেন্দ্র থেকে টাকা আদায়ের জন্য কোনো যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ রাজ্য সরকার নেয়নি। মামলা যখন করলাম, তখন কেন্দ্র থেকে তথ্য দিয়ে দেখিয়ে দিল যে কীভাবে তৃণমূল সরকার দুর্নীতি করেছে। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, না হচ্ছে এই নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। আদতে রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার নানা বাহানা করে ১০০ দিনের কাজটা বন্ধ করতে চাইছে। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট নির্দেশ দিল যে, দুর্নীতির ব্যাপারে যা তদন্ত তা কেন্দ্র করে যাক, তাতে আপত্তি কিছু নেই। কিন্তু একশ দিনের কাজটা চালু করতে হবে অগাস্ট মাস থেকে।"
তিনি বলেন, "তৃণমূল সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকত, তাহলে অগাস্ট মাস থেকে একশ দিনের কাজটা চালু করতে পারত আদালতের আদেশের ভিত্তিতে। তাহলে টাকা দেওয়া, না দেওয়ার সমস্যা থাকত না। কিন্তু তৃণমূল কাজ চালু করল না। ইতিমধ্যে কেন্দ্র সরকার অপ্রয়োজনীয় মামলা দাখিল করল, সেখানে তারা বললো যে দুর্নীতি হয়েছে। হাইকোর্টই তো দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কেন্দ্র সরকারকে অধিকার দিয়েছে। তাহলে তারা ব্যবস্থা না নিয়ে মামলা করল কেন? সেই জন্যই সুপ্রিম কোর্ট তাদের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট কোনো নতুন আদেশ দেয়নি, হাইকোর্টের আদেশকেই বহাল রেখেছে।"
ভাতার পরিবর্তে কর্মনিশ্চয়তা প্রকল্পকে ইতিবাচক আখ্যা দেন বিকাশরঞ্জন। বলেন, "১০০ দিনের কাজের আইনটা মানুষকে উৎসাহিত করে খেটে উপার্জন করায়, শ্রম দিয়ে জীবিকা উপার্জন করায়। এই সম্মানের জায়গাটা রাজ্য ও কেন্দ্র নষ্ট করতে চায়। ওরা মানুষকে অনুদান নির্ভর করে করে রাখতে চায়। এই অনুদান নির্ভরতাকে মানুষের শ্রম দিয়ে অর্থ রোজগারের থেকে ওরা অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়।"