কোচ অস্কার, দক্ষ বিদেশিদের জন্য ভারতসেরা ইস্টবেঙ্গল
২৫ মে ২০২৬
ভারতের অন্যতম প্রাচীন ক্লাব ইস্টবেঙ্গল বছরের পর বছর দেশের চ্যাম্পিয়ন দলের খেতাব পায়নি। অবশেষে তাদের অপেক্ষা শেষ হয়েছে।
শেষ ম্যাচে শিরোপা
ইন্ডিয়ান সুপার লিগ বা আইএসএল চ্যাম্পিয়নকে এখন দেশের সেরা দল বলা হয়। এই খেতাব কখনো জিততে পারেনি ইস্টবেঙ্গল। বিদেশি কোচ অস্কার ব্রুজোনের তত্ত্বাবধানে অবশেষে শিরোপা পেয়েছে লাল-হলুদ ব্রিগেড।
২২ বছর আগে ২০০৪ সালে জাতীয় ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। সেই ফরম্যাট এখন বদলে চালু হয়েছে আইএসএল। প্রথমবার এই খেতাবের স্বাদ পেল কলকাতার দলটি।
চূড়ান্ত ম্যাচে ইন্টার কাশীকে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয় ইস্টবেঙ্গল। একই দিনে আইএসএলের চারটি ম্যাচ ছিল। প্রথমে পিছিয়ে পড়েও জয়ী হয় ব্রুজোর দল। চ্যাম্পিয়নশিপের দৌড়ে ছিল লাল-হলুদের চিরাচরিত প্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগান। তারা শেষ ম্যাচে জিতলেও গোল পার্থক্যে চ্যাম্পিয়ন হয় ইস্টবেঙ্গল।
এই খেতাব জয়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি অনন্য নজির তৈরি করেছে কলকাতার ক্লাবটি। একই মৌসুমে তাদের নারী ও পুরুষ দল জাতীয় স্তরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এর ফলে দু'টি দলই এশীয় পর্যায়ে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করবে।
২২ বছর পরে
২০০৪-এ শেষবার দেশের সেরা ফুটবল ক্লাব হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। অধুনাপ্রয়াত কোচ সুভাষ ভৌমিকের তত্ত্বাবধানে তৃতীয়বার জাতীয় ফুটবল লিগ ঘিরে তুলেছিল। সেই দলের সদস্য ছিলেন সাবেক ভারতীয় ফুটবল তারকা বাইচুং ভুটিয়া।
লাল-হলুদ জার্সিতে অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচ খেলেছেন দেশের ফুটবল আইকন বাইচুং। তার পুরোনো দল আইএসএল জেতার পরে আবেগতাড়িত বাইচুং বলেন, "ইস্টবেঙ্গলের মতো ক্লাবের প্রতিটা মরশুমে ট্রফির লড়াইয়ে থাকা উচিত। দীর্ঘ দিনের খরা কেটে যাওয়ার পরে তারা প্রতি বছর ভারত সেরার দাবিদার হয়ে উঠবে বলে আশা করি।"
গত প্রায় দুই দশকে ইস্টবেঙ্গলের পারফরম্যান্স তেমন বলার মতো ছিল না। অথচ তার আগে সুভাষ ভৌমিকের কোচিংয়ে শিখর ছুঁয়েছিল তারা। শেষবার জাতীয় লিগ জেতার আগে ২০০৩ সালের জুলাইয়ে ইন্দোনেশিয়ায় আয়োজিত আসিয়ান ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নজির তৈরি করেছিল ইস্টবেঙ্গল।
লাল-হলুদের সেই ড্রিম টিমের সদস্য ডগলাস ডি সিলভা সুদূর ব্রাজিল থেকে ম্যাচে নজর রেখেছিলেন। তিনি ছাড়াও সেই দলের সদস্য অ্যালভিটো ডি কুনহা, দেবজিৎ ঘোষ, দীপক মণ্ডলরা এবারের জয়ে উচ্ছ্বসিত।
ইস্টবেঙ্গলের সাবেক অধিনায়ক দীপেন্দু বিশ্বাস ডিডাব্লিউকে বলেন, "ক্লাবের সমর্থকদের একটা প্রজন্ম দলের জয় দেখেনি। তারা এই জয়ের ফলে উজ্জীবিত হবে। এর ফলে যে উন্মাদনা তৈরি হবে, সেটা পশ্চিমবঙ্গের ফুটবলের পক্ষে ভালো। এর ফলে বাঙালি ফুটবলাররা আরও বেশি সংখ্যায় এগিয়ে আসবেন।"
ইস্টবেঙ্গল ছাড়াও মোহনবাগানের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন দীপেন্দু। দুই প্রধানের ক্যাপ্টেন হওয়ার বিরল নজিরের অধিকারী এই সাবেক ফুটবলার বলেন, "মোহনবাগান ভালো পারফরম্যান্স করছিল। তারা জিতছিল। ইস্টবেঙ্গল পারছিল না। এবার পুরো বিষয়টার মধ্যে একটা সামঞ্জস্য এলো। এটা আমাদের ফুটবলের জন্য ইতিবাচক। এর ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরো জোরদার হবে।"
জয়ের কারিগর
জয়ের জন্য বিশেষজ্ঞরা অনেকটাই কৃতিত্ব দিচ্ছেন ইস্টবেঙ্গলের কোচ অস্কার ব্রুজোনকে। তার ফুটবলার চয়ন, ম্যাচ রিডিং ও লড়াকু মানসিকতা দলের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল।
তিন-চারজন বিদেশি ফুটবলার এই দলের প্রাণভোমরা। স্পেনের সাউল ক্রেসপো ও ইউসুফ এজাজ্জেরি, ব্রাজিলের মিগুয়েল ফিগুইরা, তিউনিসিয়ার মহম্মদ রশিদ অন্য দলের সঙ্গে ইস্টবেঙ্গলের পার্থক্য গড়ে তুলেছেন।
এজেজ্জারি আইএসএল-এর সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন ১১টি গোল করে। তাকে দেয়া হয়েছে গোল্ডেন বুট পুরস্কার। শেষ ম্যাচে রশিদের জয়সূচক গোল তাকে নায়কের সম্মান এনে দিয়েছে।
ভারতীয় ফুটবলাররা এই বিদেশিদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে ইস্টবেঙ্গলকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। রক্ষণে আনোয়ার আলী থেকে লেফট ব্যাক জয় গুপ্ত, উইঙ্গার বিপিন সিং ও মহেশ সিং থেকে মিডফিল্ডার সৌভিক চক্রবর্তী, তরুণ স্ট্রাইকার লালরিনডিকা থেকে গোলকিপার প্রভুসুখন সিং গিল নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছেন।
এবার যে ফরম্যাটে আইএসএল খেলা হয়েছে, সেখানে সাফল্য পাওয়া কঠিন ছিল বলে মনে করেন খেলোয়াড় থেকে কোচ হয়ে ওঠা দীপেন্দু। বলেন, "এবার ডাবল লিগ খেলা হয়নি। ১৩টি ম্যাচে চ্যাম্পিয়নশিপ নির্ধারিত হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা বেশি কঠিন। যেমন ধরুন, মোহনবাগান যদি ইন্টার কাশীর বিরুদ্ধে জয় পেত, তারা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দিকে এগিয়ে যেত। ওই ম্যাচে ড্র করে তারা পিছিয়ে গেল।"
কেন দীর্ঘ অপেক্ষা
ইস্টবেঙ্গলের মতো প্রথম সারির ক্লাব যাদের ঐতিহ্য ও প্রতিষ্ঠা তুলনাহীন, তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হল কেন?
ইস্টবেঙ্গলের শীর্ষ কর্মকর্তা, চিকিৎসক শান্তিরঞ্জন দাশগুপ্ত ডিডাব্লিউকে বলেন, "আমরা দীর্ঘ দিন সাফল্য পাইনি বলে সমর্থকদের দুঃখ, আমাদের অন্তরের জ্বালা একাকার হয়ে গিয়েছিল। আসলে চ্যাম্পিয়নশিপের ফরম্যাট পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। জাতীয় লিগ, আই লিগ, আইএসএল, এসব পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে সাফল্য পেতে অনেকটা সময় পার হয়ে গেল। আমাদের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। কিন্তু অপেক্ষা দীর্ঘ হয়ে গেল ঠিকই।"
কলকাতার ক্লাব দলে বাঙালিদের উপস্থিতি ক্রমশ কমছে, তারকা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ইস্টবেঙ্গলের চ্যাম্পিয়ন দলের ক্ষেত্রেও এই কথাটা প্রযোজ্য।
শান্তিরঞ্জনের বক্তব্য, "সত্তরের দশকে বাঙালি ফুটবলারদের জোয়ার এসেছিল। তখন মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের অভিভাবকরা ছেলেদের ফুটবল খেলতে পাঠাতেন। এখন অনেক অভিভাবকই বডি-কন্ট্যাক্ট গেমে সন্তানদের পাঠাতে চান না। এর ফলে বাঙালিদের সংখ্যা কমেছে। তবে এভাবে বিষয়টা দেখা উচিত নয়। অতীতে ক্লাবের পঞ্চপাণ্ডব হিসেবে যারা পরিচিত ছিলেন, আমেদ খান, সালেহ, ভেঙ্কটেশরা তো বাঙালি ছিলেন না। তারা ক্লাবকে অনন্য সাফল্য এনে দিয়েছিলেন।"
'বাঙাল'দের আবেগ
দেশভাগের সঙ্গে ইস্টবেঙ্গলের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। শতবর্ষপ্রাচীন এই ক্লাব ১৯২০ সালে পূর্ববঙ্গের মানুষদের হাতে তৈরি। তার পরে অনেকটা নাম মাহাত্ম্যে ওপার বাংলা থেকে আসা শরণার্থী, চালু কথায় 'বাঙাল'দের সঙ্গে এই ক্লাবের অস্তিত্ব যেন এক হয়ে গিয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার সংশোধন ও অনুপ্রবেশ নিয়ে বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন অধ্যাপক মননকুমার মণ্ডল। দেশভাগ সংক্রান্ত গবেষণা প্রকল্পের প্রধান মননকুমার ডিডাব্লিউকে বলেন, "যেহেতু এখানে দেশভাগ হয়েছিল, বাংলা ভাগ হয়েছিল, পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু মানুষরা বড় সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন। তাদের সমর্থন ইস্টবেঙ্গল বহু দশক ধরে পেয়ে আসছে, তাদের প্রাণের ক্লাব ইস্টবেঙ্গল। আজকে যখন বহু নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে, যারা শরণার্থী হয়ে আসার পরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, সেই সময়ে উদ্বাস্তু মানুষের আবেগ ইস্টবেঙ্গলের জয়ে একটা সান্ত্বনা পাচ্ছে।"
ইস্টবেঙ্গলের হয়ে জয়সূচক গোল করা মহম্মদ রশিদ নিজেও একজন শরণার্থী। ফিলিস্তিনের এই ভূমিপুত্র বাঙালির সেই আবেগকে উস্কে দিয়েছেন। শেষ ম্যাচে জয়ের পরে রশিদের গায়ে দেখা গিয়েছিল ফিলিস্তিনের পতাকা।
মননকুমার বলেন, "যেখানে উদ্বাস্তুদের সমাজের বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তাদের বলা হচ্ছে 'তুমি এত সালের পরে এলে তোমার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেই'— এই পরিস্থিতিতে ইস্টবেঙ্গলের খেতাবের মধ্যে দিয়ে মানসিক যন্ত্রণা থেকে নিরাময়ের পথ খুঁজছেন সমর্থকরা। উদ্বাস্তু সমর্থকদের মনে এক অর্থে এটা ক্ষতে প্রলেপ।"