বই পড়ায় আগ্রহী করতে আছে উদ্যোগ, তবুও তলানিতে বাংলাদেশ
২৩ এপ্রিল ২০২৬
‘সিইওওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন' এর করা জরিপটি ২০২৪ সালে প্রকাশ করা হয়েছিল৷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে কতটা পাঠবিমুখ হচ্ছেন তা নিয়ে একটি গবেষণা হয়েছে৷ এতে দেখা যায়, মোবাইল ফোনে সময় দেয়া যত বাড়ছে, পাঠাভ্যাস তত কমছে৷
এই গবেষণার তিনজন গবেষকের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার আরো অনেক কারণের সঙ্গে মোবাইল ফোনও একটি বড় কারণ৷''
পাঠাভ্যাসের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার উন্নয়নের সম্পর্ক ইতিবাচক৷ বাংলাদেশে ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, যে শিক্ষার্থীরা ‘ডেভেলপিং দ্য রিডিং হ্যাবিট প্রোগ্রামে' অংশ নেয় তাদের বোর্ড ও স্কুলের পরীক্ষার ফলাফল যারা অংশ নেয় না, তাদের চেয়ে বেশ ভালো৷
বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে
‘সিইওওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন' এর জরিপ বলছে, বাংলাদেশে একজন মানুষ বছরে গড়ে ৬২ ঘণ্টা বই পড়েন৷ দিনে মাত্র ১০ মিনিট৷ গড়ে একজন মানুষ বছরে ২.৭৫টি বই পড়েন৷ সে হিসেবে ১০২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭৷
আর দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভারতে বছরে একজন মানুষ গড়ে ৩৫২ ঘণ্টা বই পড়েন৷ বছরে একজন বই পড়েন ১৬টি৷
এই তালিকায় সবার শীর্ষে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র৷ আর সবার নিচে আছে আফগানিস্তান৷ পাকিস্তানের অবস্থানও বাংলাদেশের পরে (১০০)৷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে কতটা পাঠবিমুখ হচ্ছেন তা নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়েছে৷ ওই গবেষণার শিরোনাম ‘‘মোবাইল ফোন আলাপন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব''৷ তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ১০০ শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ করে৷ জরিপে দেখা যায় মোবাইল ফোনে যারা যত বেশি সময় ব্যয় করে তাদের পরীক্ষার ফলাফল তত খারাপ৷ আর ওই মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোনো বই পড়েন না৷ গবেষণায় বলা হয় মোবাইল ফোনে সময় দেয়া যত বাড়ছে, পাঠাভ্যাস তত বিপরীতমুখী হয়ে কমছে৷ বই কেনার প্রবণতাও কমছে৷ কারণ তাদের অর্থের বড় একটি অংশ মোবাইল ফোনের খরচ মেটাতে চলে যায়৷
ওই গবেষণার একজন গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘‘মোবাইল ফোন ব্যবহারের ভালো দিক হলো শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পাঠ্যবই বা অন্য বই সহজে পড়তে পারেন৷ কিন্তু খারাপ দিক হলো তারা সেটা করতে গিয়ে কোনো ভিডিও বা বিনোদনে ঢুকে পড়েন৷ সেখানেই বেশি সময় দেন৷ আর অযথা মোবাইলে কথা বলেও সময় নষ্ট করেন৷ পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার আরো অনেক কারণের সঙ্গে এই মোবাইল ফোনও একটি বড় কারণ৷'' তিনি বলেন, ‘‘সাধারণ পর্যবেক্ষণেই এটা স্পষ্ট যে এখন বই পড়ার অভ্যাস ব্যাপকভাবে কমছে বাংলাদেশে৷''
পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার যত উদ্যোগ
পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় কাজটি বাংলাদেশে করছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র৷ আলোকিত মানুষ গড়ার লক্ষ্যে তাদের পুরো কার্যক্রমই পাঠাভ্যাস কেন্দ্রিক৷ তবে এর মধ্যে বিশেষভাবে রয়েছে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ও পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি৷ আছে ‘আলোর ইশকুল' কর্মসূচি৷
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচির যুগ্ম পরিচালক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সুমন বলেন, ‘‘দেশের এক হাজার ৪০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখন আমরা বই পড়া কর্মসূচি পরিচালনা করছি৷ প্রায় সব জেলায়ই আমাদের কর্মসূচি আছে৷ বর্তমানে এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত আছে এক লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থী৷ আর ছোট-বড় গাড়ি মিলিয়ে আমাদের ৭৬টি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি আছে৷ ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির পাঠক আছে তিন লাখ ৭৫ হাজার৷ আমরা প্রায় তিন হাজার ২০০ স্পটে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সুবিধা দিতে পারি৷ এটা সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত৷ আলোর ইশকুল নামে অনলাইন ভিত্তিক বই পড়া কার্যক্রম আছে ঢাকার জন্য৷ আমাদের ভ্রাম্যমাণ বই মেলা আছে৷ আর আমাদের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে দুই লাখেরও বেশি বই আছে৷ আমরা বইও প্রকাশ করি৷ এপর্যন্ত আমাদের ৫৭৪টি প্রকাশনা আছে৷''
‘‘আমরা মূলত সরকারের সহায়তা নিয়েই এইসব কার্যক্রম চালাই৷ দুই-একটি কাজে সামান্য কিছু বাইরের বা বিদেশি সহায়তা নিয়েছি৷ যেমন ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি যখন শুরু হয়, তখন নোরাড (নরওয়ের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা ব্যবস্থাপনা সংস্থা) আমাদের চারটি গাড়ি দিয়েছিলো,'' বলেন তিনি৷
শুরুতে নিজস্ব অর্থায়নে হলেও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির পুরোটাই এখন সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে৷ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি প্রকল্প নামে যে প্রকল্প আছে ওই প্রকল্পই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে৷ সর্বশেষ ২০১৮ সাল থেকে শুরু হওয়া ওই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত৷ এই প্রকল্পের খরচ ১৪৯.৫৭ কোটি টাকা৷
এই প্রকল্পের পরিচালক সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) মু: বিল্লাস হোসেন খান৷ তিনি জানান, ‘‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে এটা আমাদের তৃতীয় সংশোধিত প্রকল্প৷ এর আগে আরো দুইটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে৷''
‘‘এখানে যেসব বই পড়ানো হয় তা আমরাই ঠিক করে দিই৷ আমরা পুরো প্রকল্প মনিটরিং করি৷ জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আমাদের লোক থাকে,'' বলেন তিনি৷
গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনীষ চাকমা বলেন, ‘‘ওই প্রকল্পের ঠিকাদার হলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র৷ তাদের মাধ্যমে আমরা বাস্তবায়ন করছি৷ কী বই পড়ানো হবে তা আমরা পুরোটাই ঠিক করে দিই৷''
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচির যুগ্ম পরিচালক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সুমন বলেন, ‘‘হ্যাঁ, কী বই পড়ানো হবে সেই সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে নেই৷ এটা সরকার ঠিক করে দেয়৷''
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বৃহস্পতিবার বৈঠক করেছেন৷ বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, বৈঠকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে৷ শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সরকারের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র একসঙ্গে কাজ করার বিষয়টিও বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে৷''
বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও ডা. জাহেদ উর রহমান৷
এর আগে ১৬ এপ্রিলও তারা বৈঠক করেন৷ কেন্দ্রের যুগ্ম পরিচালক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সুমন প্রথম বৈঠক সম্পর্কে বলেন, ‘‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে সরকার কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে৷ কোনো চুক্তি হয়নি৷''
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘সরকারের সহায়তায় আমরা এখন যে কাজ করছি সেখানে মডেলটি আমাদের৷ কিন্তু কী পড়ানো হবে তা আমরা ঠিক করি না, সরকার ঠিক করে৷''
বাংলাদেশে ‘রুম টু রিড' নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান বই পড়া নিয়ে কাজ করছে৷ তাদের মাধ্যমেও সরকার কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে৷ বিশেষ করে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের তাদের ৬৪ জেলায় যে পাবলিক লাইব্রেরি আছে তার মাধ্যমে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার কাজ করছে৷ তারা ‘বুকস ইন ব্যাগ' নামে একটি প্রকল্প শুরু করেছে৷ এর মাধ্যমে জেলার ৫ কিলোমিটার এলাকায় পাঠকদের বই পৌঁছে দেয়া হয়৷ আর এই কাজে রুম টু রিড সহায়তা করছে বলে জানান গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনিষ চাকমা৷
রুম টু রিড-এর অ্যাডভোকেসি এন্ড স্টেকহোল্ডার ম্যানেজার মো. হাফিজুর রহমান জানান, ‘‘সাতটি জেলায় আমাদের কাজ আছে৷ আমরা দুইভাবে কাজ করি৷ একটা হলো সরকারে সাথে৷ আরেকটি মাঠ পর্যায়ে আমাদের নিজস্ব প্রকল্প আছে৷ আমাদের দুইটি প্রোগ্রাম আছে৷ একটি সেকেন্ডারি এডুকেশন৷ আরেকটি প্রাইমারি৷''
‘‘আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমাদের শিশুদের বাংলা ভাষায় দক্ষতা কম৷ কিন্তু বইগুলো বাংলায়৷ ফলে পাঠাভ্যাস বাধাগ্রস্ত হয়৷ সে কারণে আমরা পাঠাভ্যাসের সাথে কোয়ালিটি রিডিংকে গুরুত্ব দিই৷ আমরা শিশুরা যেন বাংলা ভাষা ভালোভাবে পড়তে পারে সেই কার্যক্রমে জোর দেই৷ পড়তে পারলে পাঠাভ্যাসও গড়ে ওঠে৷''
‘‘আমরা শ্রেণিকক্ষ পাঠাগার স্থাপনেরও উদ্যোগ নিয়েছি৷ আর আমরা যে বইগুলো প্রকাশ করছি তা পাঠক্রমেও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে৷ বইগুলো আমাদের সরকার ছেপে দিচ্ছে৷ আমাদের যেসব এলাকায় কাজ আছে সেখানে আমরা দেখেছি পাঠাভ্যাসের উন্নতি হচ্ছে৷ কিন্তু অনেক জেলায়তো আমাদের কার্যক্রম নেই,'' বলেন তিনি৷
রুম টু রিড এপর্যন্ত এক লাখ ১০ হাজার ৬১১ শিশুকে ১২ লাখ ৯৪ হাজার ৫৪টি বই পড়িয়েছে৷ প্রতিটি শিশু গড়ে ১১.৭টি বই পড়েছে৷
পাঠাভ্যাসের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার উন্নয়নের সম্পর্ক ইতিবাচক৷ ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট এর অধীনে ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, যেসব শিক্ষার্থীরা ‘ডেভেলপিং দ্য রিডিং হ্যাবিট প্রোগ্রামে' অংশ নেয় তাদের বোর্ড ও স্কুলের পরীক্ষার ফলাফল যারা অংশ নেয় না, তাদের চেয়ে বেশ ভালো৷ তারা ২৬টি উপজেলায় ৬০ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর ওই জরিপ পরিচালনা করে৷ এতে দেখা গেছে যারা পরীক্ষায় ভালো করছে তাদের ৬০ শতাংশ পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়েছে৷
বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি এন্ড অ্যাকসেস এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট (এসইকিউএইপি)-এর অধীনে পাঠাভ্যাস বাড়ানোর জন্য নেয়া সরকারের ওই প্রকল্পে ১২ হাজার সেকেন্ডারি স্কুল ও সমমমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল৷ ওই গবেষণায় আরো বলা হয় পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার অভ্যাস শিক্ষার্থীদের ক্লাস পরীক্ষার ফলাফল ভালো করতে সহায়তা করে৷
বাংলাদেশে জাতীয় গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের অধীনে ঢাকায় কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার ছাড়াও সব জেলায় একটি করে জেলা গণগ্রন্থাগার আছে৷ এর মোট সংখ্যা ৭১টি৷
গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনীষ চাকমা বলেন, ‘‘আমরা চেষ্টা করছি পাঠাভ্যাস বাড়াতে৷ এজন্য নানা উদ্যোগ নিচ্ছি৷ আমাদের লাইব্রেরিয়ানরা যেন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাগরিকদের কাছে বই পৌঁছে দেয়ার কাজ করতে পারে সেজন্য একটি প্রকল্প বিবেচনাধীন আছে৷ আমাদের স্কুল প্রোগ্রাম আছে৷ আর বুকস ইন ব্যাগস নামেও একটি প্রকল্প চালু করেছি৷ এর মাধ্যমে আমরা পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছি৷ আর পাবলিক লাইব্রেরিতে কমিউনিটিকে এনগেজ করার চেষ্টা করছি৷ আমরা কোয়ালিটি রিডিং-এও গুরুত্ব দিচ্ছি৷ আমরা এসব কাজে রুম টু রিড নামে একটি আন্তর্জাতিক এনজিওকে যুক্ত করেছি৷''
তবে অধিদপ্তরের অধীনে ৪৯ কোটি ৯৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয়ে গণগ্রন্থাগারের অনলাইন সেবার নামে যে প্রকল্প হয়েছে তা কাজে আসছে না বলে অভিযোগ আছে৷ মহাপরিচালক বলেন, ‘‘এটা আগে হয়েছে৷ এখন আমরা এটাকে কার্যকর করার চেষ্টা করছি৷''
সারা দেশে ৭১টি সরকারি গণগ্রন্থাগার ছাড়াও বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত এক হাজার ৫৩২টি গ্রন্থাগার সরকারিভাবে নিবন্ধিত৷ তবে এরমধ্যে এক হাজার ২০০ গ্রন্থাগার সচল আছে৷ এগুলো দেখভাল করে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র৷ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৪৩ গ্রন্থাগারকে সরকার মোট দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে৷ ওই সময়ে বই দিয়েছে দুই কোটি ৭০ লাখ৷ তবে এই বইগুলো রাজনৈতিক এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পছন্দে কেনা হয় বলে অভিযোগ আছে৷ কোনো কোনো কর্মকর্তা তার নিজের এবং স্ত্রীর বইও তালিকায় ঢুকিয়ে দেন বলে অভিযোগ৷
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক এ এইচ এম সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘‘বই বাছাই করার কমিটি করে মন্ত্রণালয়৷ সেখানে আমাদের একজন প্রতিনিধি থাকেন৷ ফলে কোন বই কেনা হবে সে সিদ্ধান্ত আমরা নিই না, মন্ত্রণালয় নেয়৷'' প্রসঙ্গত, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে৷
সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘‘আমরা পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছি৷ আমরা আট বিভাগে বই মেলা করব৷ আমরা বই দিবসে র্যালি করেছি৷ আমরা পাঠাগারগুলো পরিদর্শন করছি৷ সার্বিক অবস্থা জানার চেষ্টা করছি৷ শতবর্ষী পাঠাগারগুলো চিহ্নিত করছি৷''
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘‘পাঠাভ্যাস বাড়ানোর যে উদ্যোগগুলো আছে, দেখা যাচ্ছে সেখানে বই বাছাই করে দেয় সরকার৷ ফলে যারা ক্ষমতায় থাকে তারা যেভাবে বিবেচনা করেন সেইভাবে বই কেনা হয়৷ আমার মনে হয় বই বাছাইয়ে স্বাধীন ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রাধান্য থাকা উচিত৷''
তিনি বলেন, ‘‘পাঠাভ্যাস বাড়াতে সরকারের সরাসরি কোনো উদ্যোগ নেই৷ এটা দুঃখজনক৷ এব্যাপারে সরকারের জোরালো উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন৷ পাঠাভ্যাসের সঙ্গে দরকার কোয়ালিটি রিডিং৷ এখন শিক্ষার্থীরা বই বিমুখ হচ্ছে৷ তারা পাঠ্যবইও পড়ছে অনলাইনে, অথবা ফটোকপি করে৷ ফলে বইয়ের সঙ্গে তাদের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না৷ তারা বই পড়ছে, লাইব্রেরিতে যাচ্ছে পরীক্ষায় পাসের জন্য, বিসিএস পরীক্ষা দেয়ার জন্য৷ আমরা যে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের কথা বলছি তা থেকে পিছিয়ে পড়ছি৷''
অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘‘এখানে অভিভাবকদেরও দায় আছে, আমরাও পড়ছি না৷ শিশুরা, শিক্ষার্থীরা তো আমাদের দেখে শিখবে৷''