1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

বই পড়ায় আগ্রহী করতে আছে উদ্যোগ, তবুও তলানিতে বাংলাদেশ

২৩ এপ্রিল ২০২৬

বিশ্বের ১০২টি দেশের মানুষের পাঠাভ্যাস নিয়ে করা জরিপে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭, আর ভারত আছে দ্বিতীয় অবস্থানে৷ জরিপ বলছে, বাংলাদেশের একজন মানুষ বছরে গড়ে ২.৭৫টি বই পড়েন৷ আর ভারতে পড়েন ১৬টি৷

https://p.dw.com/p/5CieS
অমর একুশে বইমেলায় বই হাতে কয়েকজন শিশু (প্রতীকী ছবি)
‘সিইওওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন' এর জরিপ বলছে, বাংলাদেশে একজন মানুষ বছরে গড়ে ৬২ ঘণ্টা বই পড়েন৷ দিনে মাত্র ১০ মিনিট৷ গড়ে একজন মানুষ বছরে ২.৭৫টি বই পড়েন৷ সে হিসেবে ১০২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭৷ছবি: Abdul Goni

‘সিইওওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন' এর করা জরিপটি ২০২৪ সালে প্রকাশ করা হয়েছিল৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে কতটা পাঠবিমুখ হচ্ছেন তা নিয়ে একটি গবেষণা হয়েছে৷ এতে দেখা যায়, মোবাইল ফোনে সময় দেয়া যত বাড়ছে, পাঠাভ্যাস তত কমছে৷

এই গবেষণার তিনজন গবেষকের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার আরো অনেক কারণের সঙ্গে মোবাইল ফোনও একটি বড় কারণ৷''

পাঠাভ্যাসের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার উন্নয়নের সম্পর্ক ইতিবাচক৷ বাংলাদেশে ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, যে শিক্ষার্থীরা ‘ডেভেলপিং দ্য রিডিং হ্যাবিট প্রোগ্রামে' অংশ নেয় তাদের বোর্ড ও স্কুলের পরীক্ষার ফলাফল যারা অংশ নেয় না, তাদের চেয়ে বেশ ভালো৷

বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে

‘সিইওওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন' এর জরিপ বলছে, বাংলাদেশে একজন মানুষ বছরে গড়ে ৬২ ঘণ্টা বই পড়েন৷ দিনে মাত্র ১০ মিনিট৷ গড়ে একজন মানুষ বছরে ২.৭৫টি বই পড়েন৷ সে হিসেবে ১০২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭৷

আর দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভারতে বছরে একজন মানুষ গড়ে ৩৫২ ঘণ্টা বই পড়েন৷ বছরে একজন বই পড়েন ১৬টি৷

এই তালিকায় সবার শীর্ষে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র৷ আর সবার নিচে আছে আফগানিস্তান৷ পাকিস্তানের অবস্থানও বাংলাদেশের পরে (১০০)৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে কতটা পাঠবিমুখ হচ্ছেন তা নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়েছে৷ ওই গবেষণার শিরোনাম ‘‘মোবাইল ফোন আলাপন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব''৷ তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ১০০ শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ করে৷ জরিপে দেখা যায় মোবাইল ফোনে যারা যত বেশি সময় ব্যয় করে তাদের পরীক্ষার ফলাফল তত খারাপ৷ আর ওই মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোনো বই পড়েন না৷ গবেষণায় বলা হয় মোবাইল ফোনে সময় দেয়া যত বাড়ছে, পাঠাভ্যাস তত বিপরীতমুখী হয়ে কমছে৷ বই কেনার প্রবণতাও কমছে৷ কারণ তাদের অর্থের বড় একটি অংশ মোবাইল ফোনের খরচ মেটাতে চলে যায়৷

‘সমস্যা হচ্ছে, আমাদের শিশুদের বাংলা ভাষায় দক্ষতা কম’

ওই গবেষণার একজন গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘‘মোবাইল ফোন ব্যবহারের ভালো দিক হলো শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পাঠ্যবই বা অন্য বই সহজে পড়তে পারেন৷ কিন্তু খারাপ দিক হলো তারা সেটা করতে গিয়ে কোনো ভিডিও বা বিনোদনে ঢুকে পড়েন৷ সেখানেই বেশি সময় দেন৷ আর অযথা মোবাইলে কথা বলেও সময় নষ্ট করেন৷ পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার আরো অনেক কারণের সঙ্গে এই মোবাইল ফোনও একটি বড় কারণ৷'' তিনি বলেন, ‘‘সাধারণ পর্যবেক্ষণেই এটা স্পষ্ট যে এখন বই পড়ার অভ্যাস ব্যাপকভাবে কমছে বাংলাদেশে৷''

পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার যত উদ্যোগ

পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় কাজটি বাংলাদেশে করছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র৷ আলোকিত মানুষ গড়ার লক্ষ্যে তাদের পুরো কার্যক্রমই পাঠাভ্যাস কেন্দ্রিক৷ তবে এর মধ্যে বিশেষভাবে রয়েছে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ও পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি৷ আছে ‘আলোর ইশকুল' কর্মসূচি৷

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচির যুগ্ম পরিচালক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সুমন বলেন, ‘‘দেশের এক হাজার ৪০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখন আমরা বই পড়া কর্মসূচি পরিচালনা করছি৷ প্রায় সব জেলায়ই আমাদের কর্মসূচি আছে৷ বর্তমানে এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত আছে এক লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থী৷ আর ছোট-বড় গাড়ি মিলিয়ে আমাদের ৭৬টি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি আছে৷ ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির পাঠক আছে তিন লাখ ৭৫ হাজার৷ আমরা প্রায় তিন হাজার ২০০ স্পটে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সুবিধা দিতে পারি৷ এটা সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত৷ আলোর ইশকুল নামে অনলাইন ভিত্তিক বই পড়া কার্যক্রম আছে ঢাকার জন্য৷ আমাদের ভ্রাম্যমাণ বই মেলা আছে৷ আর আমাদের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে দুই লাখেরও বেশি বই আছে৷ আমরা বইও প্রকাশ করি৷ এপর্যন্ত আমাদের ৫৭৪টি প্রকাশনা আছে৷''

‘‘আমরা মূলত সরকারের সহায়তা নিয়েই এইসব কার্যক্রম চালাই৷ দুই-একটি কাজে সামান্য কিছু বাইরের বা বিদেশি সহায়তা নিয়েছি৷ যেমন ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি যখন শুরু হয়, তখন নোরাড (নরওয়ের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা ব্যবস্থাপনা সংস্থা) আমাদের চারটি গাড়ি দিয়েছিলো,'' বলেন তিনি৷

‘১৪০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমরা বই পড়া কর্মসূচি পরিচালনা করছি’

শুরুতে নিজস্ব অর্থায়নে হলেও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির পুরোটাই এখন সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে৷ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি প্রকল্প নামে যে প্রকল্প আছে ওই প্রকল্পই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে৷ সর্বশেষ ২০১৮ সাল থেকে শুরু হওয়া ওই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত৷ এই প্রকল্পের খরচ ১৪৯.৫৭ কোটি টাকা৷

এই প্রকল্পের পরিচালক সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) মু: বিল্লাস হোসেন খান৷ তিনি জানান, ‘‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে এটা আমাদের তৃতীয় সংশোধিত প্রকল্প৷ এর আগে আরো দুইটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে৷''

‘‘এখানে যেসব বই পড়ানো হয় তা আমরাই ঠিক করে দিই৷ আমরা পুরো প্রকল্প মনিটরিং করি৷ জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আমাদের লোক থাকে,'' বলেন তিনি৷

গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনীষ চাকমা বলেন, ‘‘ওই প্রকল্পের ঠিকাদার হলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র৷ তাদের মাধ্যমে আমরা বাস্তবায়ন করছি৷ কী বই পড়ানো হবে তা আমরা পুরোটাই ঠিক করে দিই৷''

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচির যুগ্ম পরিচালক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সুমন বলেন, ‘‘হ্যাঁ, কী বই পড়ানো হবে সেই সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে নেই৷ এটা সরকার ঠিক করে দেয়৷''

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বৃহস্পতিবার বৈঠক করেছেন৷ বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, বৈঠকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে৷ শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সরকারের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র একসঙ্গে কাজ করার বিষয়টিও বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে৷''

বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও ডা. জাহেদ উর রহমান৷

এর আগে ১৬ এপ্রিলও তারা বৈঠক করেন৷ কেন্দ্রের যুগ্ম পরিচালক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সুমন প্রথম বৈঠক সম্পর্কে বলেন, ‘‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে সরকার কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে৷ কোনো চুক্তি হয়নি৷''

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘সরকারের সহায়তায় আমরা এখন যে কাজ করছি সেখানে মডেলটি আমাদের৷ কিন্তু কী পড়ানো হবে তা আমরা ঠিক করি না, সরকার ঠিক করে৷''

বাংলাদেশে ‘রুম টু রিড' নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান বই পড়া নিয়ে কাজ করছে৷ তাদের মাধ্যমেও সরকার কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে৷ বিশেষ করে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের তাদের ৬৪ জেলায় যে পাবলিক লাইব্রেরি আছে তার মাধ্যমে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার কাজ করছে৷ তারা ‘বুকস ইন ব্যাগ' নামে একটি প্রকল্প শুরু করেছে৷ এর মাধ্যমে জেলার ৫ কিলোমিটার এলাকায় পাঠকদের বই পৌঁছে দেয়া হয়৷ আর এই কাজে রুম টু রিড সহায়তা করছে বলে জানান গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনিষ চাকমা৷

রুম টু রিড-এর অ্যাডভোকেসি এন্ড স্টেকহোল্ডার ম্যানেজার মো. হাফিজুর রহমান জানান, ‘‘সাতটি জেলায় আমাদের কাজ আছে৷ আমরা দুইভাবে কাজ করি৷ একটা হলো সরকারে সাথে৷ আরেকটি মাঠ পর্যায়ে আমাদের নিজস্ব প্রকল্প আছে৷ আমাদের দুইটি প্রোগ্রাম আছে৷ একটি সেকেন্ডারি এডুকেশন৷ আরেকটি প্রাইমারি৷''

‘‘আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমাদের শিশুদের বাংলা ভাষায় দক্ষতা কম৷ কিন্তু বইগুলো বাংলায়৷ ফলে পাঠাভ্যাস বাধাগ্রস্ত হয়৷ সে কারণে আমরা পাঠাভ্যাসের সাথে কোয়ালিটি রিডিংকে গুরুত্ব দিই৷ আমরা শিশুরা যেন বাংলা ভাষা ভালোভাবে পড়তে পারে সেই কার্যক্রমে জোর দেই৷ পড়তে পারলে পাঠাভ্যাসও গড়ে ওঠে৷''

‘‘আমরা শ্রেণিকক্ষ পাঠাগার স্থাপনেরও উদ্যোগ নিয়েছি৷ আর আমরা যে বইগুলো প্রকাশ করছি তা পাঠক্রমেও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে৷ বইগুলো আমাদের সরকার ছেপে দিচ্ছে৷ আমাদের যেসব এলাকায় কাজ আছে সেখানে আমরা দেখেছি পাঠাভ্যাসের উন্নতি হচ্ছে৷ কিন্তু অনেক জেলায়তো আমাদের কার্যক্রম নেই,'' বলেন তিনি৷

রুম টু রিড এপর্যন্ত এক লাখ ১০ হাজার ৬১১ শিশুকে ১২ লাখ ৯৪ হাজার ৫৪টি বই পড়িয়েছে৷ প্রতিটি শিশু গড়ে ১১.৭টি বই পড়েছে৷

পাঠাভ্যাসের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার উন্নয়নের সম্পর্ক ইতিবাচক৷ ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট এর অধীনে ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, যেসব শিক্ষার্থীরা ‘ডেভেলপিং দ্য রিডিং হ্যাবিট প্রোগ্রামে' অংশ নেয় তাদের বোর্ড ও স্কুলের পরীক্ষার ফলাফল যারা অংশ নেয় না, তাদের চেয়ে বেশ ভালো৷ তারা ২৬টি উপজেলায় ৬০ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর ওই জরিপ পরিচালনা করে৷ এতে দেখা গেছে যারা পরীক্ষায় ভালো করছে তাদের ৬০ শতাংশ পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়েছে৷

বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি এন্ড অ্যাকসেস এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট (এসইকিউএইপি)-এর অধীনে পাঠাভ্যাস বাড়ানোর জন্য নেয়া সরকারের ওই প্রকল্পে ১২ হাজার সেকেন্ডারি স্কুল ও সমমমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল৷ ওই গবেষণায় আরো বলা হয় পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার অভ্যাস শিক্ষার্থীদের ক্লাস পরীক্ষার ফলাফল ভালো করতে সহায়তা করে৷

বাংলাদেশে জাতীয় গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের অধীনে ঢাকায় কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার ছাড়াও সব জেলায় একটি করে জেলা গণগ্রন্থাগার আছে৷ এর মোট সংখ্যা ৭১টি৷

গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনীষ চাকমা বলেন, ‘‘আমরা চেষ্টা করছি পাঠাভ্যাস বাড়াতে৷ এজন্য নানা উদ্যোগ নিচ্ছি৷ আমাদের লাইব্রেরিয়ানরা যেন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাগরিকদের কাছে বই পৌঁছে দেয়ার কাজ করতে পারে সেজন্য একটি প্রকল্প বিবেচনাধীন আছে৷ আমাদের স্কুল প্রোগ্রাম আছে৷ আর বুকস ইন ব্যাগস নামেও একটি প্রকল্প চালু করেছি৷ এর মাধ্যমে আমরা পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছি৷ আর পাবলিক লাইব্রেরিতে কমিউনিটিকে এনগেজ করার চেষ্টা করছি৷ আমরা কোয়ালিটি রিডিং-এও গুরুত্ব দিচ্ছি৷ আমরা এসব কাজে রুম টু রিড নামে একটি আন্তর্জাতিক এনজিওকে যুক্ত করেছি৷''

তবে অধিদপ্তরের অধীনে ৪৯ কোটি ৯৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয়ে গণগ্রন্থাগারের অনলাইন সেবার নামে যে প্রকল্প হয়েছে তা কাজে আসছে না বলে অভিযোগ আছে৷ মহাপরিচালক বলেন, ‘‘এটা আগে হয়েছে৷ এখন আমরা এটাকে কার্যকর করার চেষ্টা করছি৷''

সারা দেশে ৭১টি সরকারি গণগ্রন্থাগার ছাড়াও বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত এক হাজার ৫৩২টি গ্রন্থাগার সরকারিভাবে নিবন্ধিত৷ তবে এরমধ্যে এক হাজার ২০০ গ্রন্থাগার সচল আছে৷ এগুলো দেখভাল করে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র৷ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৪৩ গ্রন্থাগারকে সরকার মোট দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে৷ ওই সময়ে বই দিয়েছে দুই কোটি ৭০ লাখ৷ তবে এই বইগুলো রাজনৈতিক এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পছন্দে কেনা হয় বলে অভিযোগ আছে৷ কোনো কোনো কর্মকর্তা তার নিজের এবং স্ত্রীর বইও তালিকায় ঢুকিয়ে দেন বলে অভিযোগ৷  

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক এ এইচ এম সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘‘বই বাছাই করার কমিটি করে মন্ত্রণালয়৷ সেখানে আমাদের একজন প্রতিনিধি থাকেন৷ ফলে কোন বই কেনা হবে সে সিদ্ধান্ত আমরা নিই না, মন্ত্রণালয় নেয়৷'' প্রসঙ্গত, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে৷

সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘‘আমরা পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছি৷ আমরা আট বিভাগে বই মেলা করব৷ আমরা বই দিবসে র‌্যালি করেছি৷ আমরা পাঠাগারগুলো পরিদর্শন করছি৷ সার্বিক অবস্থা জানার চেষ্টা করছি৷ শতবর্ষী পাঠাগারগুলো চিহ্নিত করছি৷''

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘‘পাঠাভ্যাস বাড়ানোর যে উদ্যোগগুলো আছে, দেখা যাচ্ছে সেখানে বই বাছাই করে দেয় সরকার৷ ফলে যারা ক্ষমতায় থাকে তারা যেভাবে বিবেচনা করেন সেইভাবে বই কেনা হয়৷ আমার মনে হয় বই বাছাইয়ে স্বাধীন ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রাধান্য থাকা উচিত৷''

তিনি বলেন, ‘‘পাঠাভ্যাস বাড়াতে সরকারের সরাসরি কোনো উদ্যোগ নেই৷ এটা দুঃখজনক৷ এব্যাপারে সরকারের জোরালো উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন৷ পাঠাভ্যাসের সঙ্গে দরকার কোয়ালিটি রিডিং৷ এখন শিক্ষার্থীরা বই বিমুখ হচ্ছে৷ তারা পাঠ্যবইও পড়ছে অনলাইনে, অথবা ফটোকপি করে৷ ফলে বইয়ের সঙ্গে তাদের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না৷ তারা বই পড়ছে, লাইব্রেরিতে যাচ্ছে পরীক্ষায় পাসের জন্য, বিসিএস পরীক্ষা দেয়ার জন্য৷ আমরা যে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের কথা বলছি তা থেকে পিছিয়ে পড়ছি৷''

অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘‘এখানে অভিভাবকদেরও দায় আছে, আমরাও পড়ছি না৷ শিশুরা, শিক্ষার্থীরা তো আমাদের দেখে শিখবে৷''